চার বছরে পদ্মা সেতুতে টোল আদায় ৩৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। জানুন যোগাযোগ, অর্থনীতি এবং ঋণ পরিশোধের সর্বশেষ অনন্য সব রেকর্ড ও পরিসংখ্যান।
: দেখতে দেখতে পার হয়ে গেল চারটি বছর। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার ভাগ্যবদলের চাবিকাঠি স্বপ্নের পদ্মা সেতু সাফল্যের চতুর্থ বছর পূর্ণ করেছে। ২০২২ সালের ২৬ জুন যে পথ ধরে প্রথম চাকা গড়িয়েছিল, আজ তা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। গত চার বছরে এই মহাসড়ক দিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে যাতায়াত করেছে কোটি কোটি যানবাহন। একই সাথে সরকারের রাজস্বে যুক্ত হয়েছে ৩৩০০ কোটি টাকার এক বিশাল অঙ্কের অর্থ। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বাসেক) নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সায়াদ নিলয় গণমাধ্যমকে এই অভাবনীয় অগ্রগতির পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেছেন।
চার বছরের জয়যাত্রা: টোলের খাতায় নতুন ইতিহাস
উদ্বোধনের পর থেকে এ পর্যন্ত পদ্মা সেতুতে টোল আদায়ের পরিমাণ ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিগত ৪ বছরে এই সেতু দিয়ে সর্বমোট ২ কোটি ৬৬ লাখ ৯৭ হাজার ৫১৪টি যানবাহন পারাপার হয়েছে।
এর বিপরীতে মোট টোল সংগৃহীত হয়েছে ৩ হাজার ৩০০ কোটি ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১১৪ টাকা।
প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে আরও এক ধাপ এগিয়ে গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সেতুটিতে যুক্ত করা হয়েছে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেম (ETCS)।
এর ফলে এখন কোনো রকম যানজট ছাড়াই নিমিষেই টোল পরিশোধ করে পার হওয়া যাচ্ছে প্রমত্তা নদী।
| সময়কাল (অর্থবছর) | পারাপার হওয়া যানবাহন সংখ্যা | সংগৃহীত মোট টোল (টাকায়) |
| প্রথম বছর (২৬ জুন ২০২২ – ২৪ জুন ২০২৩) | ৫৬,৯৪,৮৯৯টি | ৭৯৮ কোটি ৬০ লাখ ৯৩ হাজার ৭০০ |
| দ্বিতীয় বছর (২৫ জুন ২০২৩ – ২৪ জুন ২০২৪) | ৬৮,০১,৩৭৪টি | ৮৫০ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬,৩৫০ |
| তৃতীয় বছর (২৫ জুন ২০২৪ – ২৪ জুন ২০২৫) | ৬৯,৭৭,৩৩৪টি | ৮৫৮ কোটি ৮৭ লাখ ০২,৫৫০ |
| চতুর্থ বছরসহ মোট (২৬ জুন ২০২২ – বর্তমান) | ২,৬৬,৯৭,৫১৪টি | ৩,৩০০ কোটি ৩২ লাখ ১৬,১১৪ |
এক নজরে একদিনের সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ডসমূহ
পদ্মা সেতুর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গাড়ি পারাপার ও রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় উৎসব বা ঈদগুলো সবসময়ই বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষ করে ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার সময় টোল আদায়ের ক্ষেত্রে সর্বকালের সেরা ১ম ও ৫ নম্বর রেকর্ডটি তৈরি হয়।
১ম সর্বোচ্চ রেকর্ড (৫ জুন, ২০২৫): ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫২ হাজার ৪৮৭টি গাড়ি পারাপার হয়।
এতে একদিনেই টোল আদায় হয় ৫ কোটি ৪৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা।
২য় সর্বোচ্চ রেকর্ড (১৪ জুন, ২০২৪): ৪৪ হাজার ৩৩টি যানবাহন থেকে সরকারের আয় হয় ৪ কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার ১০০ টাকা।
৩য় সর্বোচ্চ রেকর্ড (৯ এপ্রিল, ২০২৪): ৪৫ হাজার ২০৪টি গাড়ি থেকে সংগৃহীত হয় ৪ কোটি ৮৯ লাখ ৯৪ হাজার ৭০০ টাকা।
৪র্থ সর্বোচ্চ রেকর্ড (২৭ জুন, ২০২৩): ৪৩ হাজার ১৩৭টি যানবাহন পারাপারে আয় আসে ৪ কোটি ৬০ লাখ ৫৩ হাজার ৩০০ টাকা।
৫ম সর্বোচ্চ রেকর্ড (৬ জুন, ২০২৫): ওইদিন ২৪ ঘণ্টায় ৪০ হাজার ১১৮টি গাড়ি থেকে ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ টাকা রাজস্ব আদায় হয়।
দোতলা সেতুতে সড়ক ও রেলপথের যুগলবন্দী
পদ্মা সেতু শুধু সড়ক যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি এখন দেশের অন্যতম ব্যস্ত এক সমন্বিত যোগাযোগ করিডোর।
সেতুর ওপরের তলায় দিবারাত্রি দ্রুতবেগে ছুটে চলছে বিভিন্ন ধরনের চাকাযুক্ত যানবাহন, আর নিচতলা কাঁপিয়ে চলছে ভারী ও যাত্রীবাহী ট্রেন।

২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত নতুন রেল নেটওয়ার্কের উদ্বোধন করা হয়েছিল।
এর ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পুরো রেল লিঙ্ক প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়ন ঘটে।
বর্তমানে ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু ও ভাঙ্গা হয়ে নড়াইল ও যশোর অতিক্রম করে সরাসরি খুলনা পর্যন্ত ট্রেন সার্ভিস চালু রয়েছে।
এর ফলে রাজধানী থেকে মাত্র সাড়ে ৩ ঘণ্টায় খুলনা কিংবা বেনাপোলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে, যা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোর মানুষের কাছে এক অবিশ্বাস্য স্বপ্নপূরণ।
অবকাঠামো খাতের বাইরে বহুমুখী উপযোগিতা
যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতেও এই সেতু এক অভূতপূর্ব সেতু বন্ধন তৈরি করেছে।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ: ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষ খুঁটি বা পিলার ব্যবহার করে
পায়রা ও রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সফলভাবে জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা হয়েছে।
উচ্চগতির ইন্টারনেট: সেতুর অভ্যন্তর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে উচ্চ ক্ষমতার অপটিক্যাল ফাইবার বা ইন্টারনেট লাইন, যা দক্ষিণাঞ্চলের আইটি খাতে বিপ্লব এনেছে।
গ্যাস পাইপলাইন: সেতুতে স্থাপন করা উচ্চচাপের গ্যাস লাইন ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়নকে আরও তরান্বিত করার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
ব্যয় সংকোচন ও সততার অনন্য দৃষ্টান্ত
পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় একটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়।
শুরুতে এই মেগা প্রকল্পের প্রাক্কলিত প্রাক-ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
তবে যথাযথ তদারকি ও সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে চূড়ান্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
“সঠিক পরিকল্পনা ও আর্থিক শৃঙ্খলার কারণে মূল বাজেট থেকে প্রায় ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পেরেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। যা দেশের মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ইতিহাসে এক অনন্য সততা ও দক্ষতার নজির।”
সংকুচিত এই ব্যয়ের মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা অনুদান হিসেবে এবং অবশিষ্ট ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা অর্থ বিভাগ সেতু কর্তৃপক্ষকে ঋণ হিসেবে দিয়েছে।
চুক্তি মোতাবেক মাত্র ১ শতাংশ সুদে আগামী ৩৫ বছরের মধ্যে এই ঋণের টাকা সরকারকে ফেরত দেবে বাসেক।
প্রতি অর্থবছরে ৪টি করে মোট ১৪০টি কিস্তিতে এই ঋণ পরিশোধ করা হবে, যার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৫৬-৫৭ অর্থবছর পর্যন্ত।
২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই নিয়মিতভাবে এর কিস্তি পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
নিরাপত্তা ও আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা
মূল পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার হলেও দুই প্রান্তের অ্যাপ্রোচ বা সংযোগ সড়কসহ পুরো প্রকল্পটির বিস্তার প্রায় ১০ কিলোমিটার।
এই বিশাল কাঠামো এবং যাতায়াতকারী যাত্রীদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো সেতু এবং সংযোগ সড়ক জুড়ে বসানো হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা।
এছাড়া এক্সপ্রেসওয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সেতুর ওপর যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার, যা চালকদের কঠোরভাবে মেনে চলতে হচ্ছে।
পদ্মা সেতু শুধু কংক্রিট আর স্টিলের কোনো কাঠামো নয়; এটি বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীলতা, সক্ষমতা এবং দক্ষিণ জনপদের কোটি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির এক জীবন্ত দলিল।
চার বছর পেরিয়ে এই সেতু আগামী দিনে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে, এমনটাই প্রত্যাশা বিশেষজ্ঞদের।
