বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সামরিক সিন্ডিকেট ও নতুন ভৌগোলিক সংঘাত নিয়ে অধ্যাপক ড. আরিফ খানের চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। জানুন বিস্তারিত সংবাদ প্রতিবেদন।
দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত বদ্বীপ বাংলাদেশ বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক সংকটের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডক্টর আরিফ খানের সাম্প্রতিক এক বিস্ফোরক মূল্যায়নে দাবি করা হয়েছে, দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় পতাকার মর্যাদা আজ চরম হুমকির মুখে। তাঁর মতে, নেপথ্যের এক অদৃশ্য পরাশক্তি বা ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) এবং বৈশ্বিক অক্ষের পরোক্ষ অনুমোদনে বাংলাদেশকে খণ্ড-বিখণ্ড করার এবং আঞ্চলিকভাবে অস্থিতিশীল করে একটি ‘সিরিয়া বা ইরাক সদৃশ’ সংঘাতময় অঞ্চলে পরিণত করার এক ছক তৈরি করা হচ্ছে। অনৈতিক ও জনবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় টিকে থাকা বা পৌঁছানোর মরিয়া চেষ্টা কীভাবে একটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে, ড. আরিফ খানের এই সতর্কবার্তায় সেটিই অত্যন্ত করুণভাবে ফুটে উঠেছে।
ক্ষমতার সমীকরণ, রাজনৈতিক অক্ষ ও শীর্ষ সেনাকর্তাদের সিন্ডিকেট
প্রফেসর আরিফ খানের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক নেটওয়ার্কের কথা।
তাঁর মতে, বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি (NCP) অক্ষের এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কাজ করছে সামরিক বাহিনীর ভেতরে গড়ে ওঠা অল্প কয়েকজন উঁচুতলার জেনারেলদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট বা কার্টেল।
এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে কট্টরপন্থী এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভাবধারার জুনিয়র অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসানো ও মগজধোলাইয়ের কাজে লিপ্ত রয়েছেন।
তারা সামরিক বাহিনীর প্রথাগত চেইন অব কমান্ড, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অফিসারদের নিরাপত্তার বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছেন।
আধা-সামরিক বাহিনী ও অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষের উত্থান: ভেঙে পড়বে ডিফেন্স স্ট্রাকচার?
বিশ্লেষণে সবচেয়ে উদ্বেগের যে দিকটি প্রকাশ করা হয়েছে তা হলো,
এই সংকটের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো বা সামরিক বাহিনী তার নিজস্ব ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে।
বিভিন্ন আঞ্চলিক অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষ (Non-state actors), বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এবং নতুন গজিয়ে ওঠা প্যারা-মিলিটারি বা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো সামরিক বাহিনীর হাত থেকে দেশের একাধিক সীমান্তবর্তী ও কৌশলগত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে পারে।
কিন্তু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক চক্র কিংবা স্বার্থান্বেষী সামরিক সিন্ডিকেটের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা থাকবে না,
কারণ তাদের মূল লক্ষ্য কেবল নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করা এবং সম্পদ নিশ্চিত করা।
প্রফেসর আরিফ খানের সতর্কবার্তা: “আপনারা ভাবছেন পরিস্থিতি সাধারণ থাকবে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিণতি মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক বা সিরিয়ার চেয়েও ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হতে যাচ্ছে। কারণ ওই দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান চীন, ভারত এবং বঙ্গোপসাগরের এই নতুন আমেরিকান নৌ-লজিস্টিকসের এত কাছে ছিল না।”
ট্রাই-জংশন এবং বৈশ্বিক পরাশক্তির নতুন রুট: কেন এটি ইরাক-সিরিয়ার চেয়েও ভয়াবহ?
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সাথে বাংলাদেশের এই সম্ভাব্য ভূ-রাজনৈতিক সংকটের বড় পার্থক্য হলো এর ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল ভৌগোলিক অবস্থান’।
বাংলাদেশ অবস্থান করছে এশিয়ার প্রধান তিন শক্তি—চীন, ভারত এবং ভারত মহাসাগরীয় সামরিক অক্ষের একেবারে মধ্যস্থলে।
সম্প্রতি নতুন রাজনৈতিক অক্ষের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান নতুন ‘নৌ-লজিস্টিকস’ বা সামরিক অবকাঠামোর যে প্রাথমিক সম্মতি দেওয়া হয়েছে,
তা বেইজিং এবং নয়াদিল্লি উভয়কেই চরম ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
চীন এবং তথাকথিত ডিপ স্টেট নিজেদের ভূ-কৌশলগত স্বার্থে এই অঞ্চলে যে নতুন বিন্যাস বা বাফার জোন তৈরি করতে চাইছে,
তাতে বাংলাদেশকে টুকরো টুকরো করে ফেলা বা ছোট ছোট নিয়ন্ত্রণ বলয়ে ভাগ করে দেওয়াটাই তাদের জন্য সহজ পথ হতে পারে।
জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার শেষ প্রহর
ড. আরিফ খানের এই চাঞ্চল্যকর ও কঠোর পূর্বাভাস আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার এক চরম বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
দলীয় বা ব্যক্তিগত অন্ধ রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা যখন একটি দেশকে পরাশক্তিগুলোর সামরিক দাবার ছকে পরিণত করে,
তখন তার পরিণতি কেবল কোনো একটি দলের ওপর পড়ে না—বরং পুরো দেশের মানচিত্র এবং সাধারণ জনগণের অস্তিত্ব ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ যদি এখনই তার জাতীয় ঐক্য, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্বকে এই স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করতে না পারে,
তবে দক্ষিণ এশিয়ার এই উদীয়মান বদ্বীপ সত্যি সত্যিই আন্তর্জাতিক শক্তির ছায়া-যুদ্ধের (Proxy War) এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী কুরুক্ষেত্রে পরিণত হবে।
