সামরিক সংঘাত এড়িয়ে অর্থনৈতিক চাপ ও হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে বাধ্য করছে ইরান? জানুন তেহরানের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিশ্লেষণ।
ওয়াশিংটনের ওপর তেহরানের নতুন কৌশলগত ছক
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান দ্বন্দ্ব এক নতুন ও জটিল মোড় নিয়েছে। সরাসরি সর্বাত্মক সামরিক বিজয়ের পিছু না ছুটে তেহরান বেছে নিয়েছে অত্যন্ত সুচিন্তিত ও ধীরগতির এক কৌশল। এই কৌশলের মূল ভিত্তি হলো—সামরিক শক্তির ভারসাম্যহীনতাকে পাশ কাটিয়ে অর্থনৈতিক আঘাত, বাণিজ্যিক নৌপথ অচল করে দেওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরির মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলা। উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকদের মতে, ইরান বিশ্বাস করে দীর্ঘমেয়াদী এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন একসময় ক্লান্ত হয়ে নমনীয় হতে বাধ্য হবে।
তেহরানের নীতিনির্ধারকরা খুব ভালো করেই অনুধাবন করেছেন যে, ওপেন ওয়ারফেয়ার বা সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পেরে ওঠা অসম্ভব। তাই তারা বেছে নিয়েছে ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা বৃদ্ধি’ (Controlled Escalation) নীতি। এর মধ্য দিয়ে তারা একাধারে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ এবং হরমুজ প্রণালিসহ কৌশলগত জলপথগুলোর ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
অর্থনৈতিক চাপ বনাম সামরিক শক্তির ব্যবধান
ঐতিহ্যগত সামরিক শক্তিতে ওয়াশিংটনের ধারেকাছে না থাকলেও, তেহরানের তূণে রয়েছে এমন কিছু অস্ত্র যা বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়ে দিতে যথেষ্ট। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ কমান্ডারদের সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন হলো—মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করা গেলে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মাশুল এড়াতে টেবিলে বসতে বাধ্য হবে।
- জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য পথকে টার্গেট: বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতাই বর্তমানে তেহরানের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস।
- সপ্তাহওয়ারী নতুন ফ্রন্ট তৈরি: ওয়াশিংটনকে চাপে রাখতে তেহরান অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের উত্তেজনার পরিধি এমনভাবে ছড়াচ্ছে, যাতে প্রতি সপ্তাহে নতুন কোনো ভূখণ্ড, নতুন কৌশল কিংবা ভিন্ন লক্ষ্যবস্তু সামনে এনে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের দোলাচলে রাখা যায়।
- রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ: যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করে ট্রাম্প প্রশাসনকে বড় কোনো দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়ানো থেকে বিরত রাখা এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।
কৌশলগত তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| পক্ষ | প্রধান শক্তি | বর্তমান কৌশল | দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য |
| যুক্তরাষ্ট্র | সর্বাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও বিমানবাহী রণতরী | অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক শক্তির মহড়া | ইরানকে নিঃশর্ত আলোচনার টেবিলে আনা এবং জলপথ উন্মুক্ত রাখা |
| ইরান | ভূ-কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক | নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা, নৌপথ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করা | প্রণালির প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও অর্থনৈতিক ছাড় আদায় |
হরমুজের গণ্ডি ছাড়িয়ে লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বিস্তার
একসময় সংঘাত কেবল হরমুজ প্রণালির ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি তার অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে। লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো ও স্থাপনা ঘিরে নতুন নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের জন্য বৈশ্বিক বাণিজ্য রক্ষার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশিষ্ট গবেষকদের মতে, ইরানের আসল সুবিধাটি সামরিক নয়, বরং তাদের এই সক্ষমতা রয়েছে যার মাধ্যমে তারা গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিতে পারে। মার্কিন প্রশাসন যতই কঠোর সামরিক আঘাত হানার হুমকি দিক না কেন, তেহরান তাদের প্রতিরোধমূলক ও বহুমুখী হুমকির জাল গুটিয়ে নিচ্ছে না।
বরং তারা এটি প্রমাণ করতে চাইছে যে, এই সংকটে ওয়াশিংটনের চেয়ে তাদের সহ্যক্ষমতা ও টিকে থাকার জেদ অনেক বেশি।
ভূরাজনীতিতে দরকষাকষির নতুন সমীকরণ
বর্তমান সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ।
আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের বিভিন্ন প্রস্তাবের বিপরীতে তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে,
এই জলপথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেবামূল্য আদায় এবং সার্বভৌম কর্তৃত্বের দাবি ছাড় দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা যেকোনো ধরনের একক নিয়ন্ত্রণের ঘোরবিরোধী।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওমান বা অন্যান্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সংকট সমাধানের নানা উদ্যোগ চললেও,
মাঠপর্যায়ে উভয়পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও নড়তে নারাজ।
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির প্রদর্শন চালিয়ে গেলেও ইরান তাদের বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি প্রেশার ট্যাকটিক্স বা চাপের কৌশল অব্যাহত রেখেছে।
ফলে এই স্নায়ুযুদ্ধ এবং নিম্ন মাত্রার সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেবে
এবং কোন পক্ষ দীর্ঘ সময় টিকে থাকার লড়াইয়ে জয়ী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
