বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেনাবাহিনীর প্রথম ব্যাচের অফিসার শহীদ শেখ জামালের ৭৩তম জন্মবার্ষিকীর বিশেষ প্রতিবেদন। তাঁর জীবন, মুক্তিযুদ্ধ ও সামরিক ক্যারিয়ার জানুন।
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৮ এপ্রিল ২০২৬
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় পুত্র, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম লং কোর্সের অন্যতম চৌকস অফিসার শহীদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামালের ৭৩তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৫৪ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক জীবন এবং তাঁর বহুমুখী প্রতিভার স্মরণে আজ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁর দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও অসামান্য অবদান এক অনন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
শৈশব, শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক অনুরাগ
টুঙ্গিপাড়ার পৈতৃক মাটিতে শৈশব কেটেছে শেখ জামালের। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য তাঁকে রাজধানী ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। তিনি তৎকালীন ঢাকার অন্যতম সুনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ-এ।
লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। একজন সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ হিসেবে তিনি যেমন নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন, তেমনি ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবেও তাঁর সমকালীন বন্ধুদের মাঝে ব্যাপক পরিচিতি ছিল। তাঁর এই প্রাণোচ্ছ্বল ব্যক্তিত্ব সবার মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও সম্মুখসমরে বীরত্ব
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন পুরো পরিবারসহ শেখ জামালও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দ্বারা ধানমন্ডির বাড়িতে গৃহবন্দি হন। চরম অনিশ্চয়তা ও বিপদের মুখেও তিনি বসে থাকেননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘেরাও ভেদ করে তিনি আত্মগোপন করেন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে ভারতের আগরতলায় পৌঁছান।
আগরতলায় পৌঁছানোর পর তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ঐতিহাসিক ‘মুজিব বাহিনী’-তে যোগ দেন। সেখানে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ৯ নম্বর সেক্টরে সম্মুখসমরে অংশ নেন। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে তিনি যে বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। দেশের স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর এই প্রত্যক্ষ অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
সামরিক জীবন ও প্রফেশনাল এক্সিলেন্স
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠিত হলে শেখ জামাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ‘লং কোর্স’-এর অন্যতম ব্যাচ কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। সামরিক দক্ষতাকে আরও শাণিত করতে ১৯৭৪ সালে তিনি যুগোস্লাভিয়ার মর্যাদাপূর্ণ মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে ক্যাডেট প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত স্যান্ডহার্স্ট রয়্যাল মিলিটারি অ্যাকাডেমি থেকেও বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
দেশে ফিরে তিনি ঢাকা সেনানিবাসের গৌরবোজ্জ্বল দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ‘সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট’ পদে কর্মজীবন শুরু করেন।
দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলে কর্মরত থাকাকালীন অত্যন্ত স্বল্প সময়েই তিনি তার অসাধারণ পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং আন্তরিকতার স্বাক্ষর রাখেন।
সহকর্মী অফিসার ও সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক দ্রুত গড়ে ওঠে।
প্রশিক্ষণ মাঠের রণকৌশল ক্লাস কিংবা কঠিন অবস্টাকল ক্রসিং—সবক্ষেত্রেই তিনি সৈনিকদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে মুগ্ধ করতেন। এছাড়া তিনি ব্যাটালিয়ন
বক্সিং টিমের সদস্যদের নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতেন, যা সৈনিকদের মাঝে তাঁর জনপ্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
শোকের ১৫ আগস্ট ও নির্মম সমাপ্তি
পেশাগত দায়িত্ব পালনে সর্বদা নিষ্ঠাবান ছিলেন শেখ জামাল।
১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট রাতে তিনি ব্যাটালিয়ন ডিউটি অফিসার হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত সততার সঙ্গে পালন করেন।
দায়িত্ব শেষ করে ওই রাতেই তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাসভবনে ফেরেন।
কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম কালরাতে, অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভোররাতে ঘাতকদের নির্মম বুলেটের আঘাতে
পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে শহীদ হন উদীয়মান এই তরুণ সেনা কর্মকর্তা।
তাঁর এই নৃশংস মৃত্যু দেশের সামরিক বাহিনী ও পুরো জাতির জন্য অপূরণীয় এক ক্ষতি ডেকে আনে।
স্মরণে ও শ্রদ্ধায় আজকের কর্মসূচি
শহীদ লেফটেন্যান্ট শেখ জামালের ৭৩তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
এর মধ্যে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তাঁর পবিত্র সমাধিতে ফুল দিয়ে গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এ সময় শহীদ শেখ জামালের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত হয়।
