“মব মানেই সোশ্যাল ক্যাপিটাল”—ড. ইউনুসের এই মন্তব্য কি আমাদের জনশক্তিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে, নাকি দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে তৈরি করছে নতুন প্রশ্ন? জানুন এই বিশ্লেষণমূলক কলামে।

সাম্প্রতিক এক আলোচনায় একজন রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগজনক মন্তব্য, “এখনো মব হচ্ছে!”—এই বাক্যটি যেমন প্রশ্ন তুলেছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে, তেমনি সেটি উল্টে রূপ নিয়েছে একটি রাজনৈতিক-সামাজিক তামাশায়। আশিক ভাইয়ের হাস্যরসাত্মক উত্তর, “ওটা তো আমাদের ইনোভেটিভ ওয়ার্কফোর্স!” এবং এরপর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের গম্ভীর উচ্চারণ—“মব মানেই সোশ্যাল ক্যাপিটাল!”—এই সংলাপ এখন মিম সংস্কৃতির খাদ্য এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সোশ্যাল ক্যাপিটাল তত্ত্ব মূলত সামাজিক আস্থা, নেটওয়ার্ক এবং সহযোগিতার মানকে বোঝায়—যা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সহায়ক। কিন্তু এই ধারণা যদি হঠাৎ একগুচ্ছ বিক্ষুব্ধ জনতার কর্মকাণ্ডে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেটি বাস্তবিক অর্থে 'সোশ্যাল ক্যাপিটাল' নয়, বরং 'পপুলার র্যাডিকালিজম'-এর প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে ড. ইউনুসের বক্তব্য হয়তো মানবসম্পদের সম্ভাবনার ওপর আলোকপাত করতে চেয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা বলছে—আইনের শাসন ও শৃঙ্খলার অভাবকে আড়াল করতে গিয়ে যদি 'মব'-কে মহিমান্বিত করা হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা কেবল ভয় পাবেন।
প্রতিটি বিদেশি বিনিয়োগকারী চায় স্থিতিশীল প্রশাসন, পরিষ্কার নীতিমালা এবং আইনের শাসন। যখন তারা বাংলাদেশের দিকে তাকায়, তখন তারা দেখতে চায় স্কিলড ওয়ার্কফোর্স, নিরাপদ পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা।
কিন্তু যখন মিডিয়ায় বা কূটনৈতিক মহলে আলোচনায় উঠে আসে এমন মন্তব্য—”মব মানেই সোশ্যাল ক্যাপিটাল”, তখন সেটি একদিকে যেমন প্রগতিশীল ভাবনার মোড়ক মনে হতে পারে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আইন প্রয়োগের অক্ষমতা প্রকাশ করে।
ফলাফল? দেশ পরিণত হয় একটি ভাইরাল মিমে—যা সামাজিক মাধ্যমে ট্রেন্ডিং হয়, কিন্তু বিনিয়োগের খাতায় কোনো সংখ্যা যোগ করে না।
একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব যখন কোনো সমস্যাকে ইনোভেশন বা সোশ্যাল ক্যাপিটালের মোড়কে উপস্থাপন করে, তখন সেটি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের প্রশ্ন তোলে। "মব" কে উদ্ভাবনী শক্তি হিসেবে চিত্রায়ন করা একধরনের বাস্তবতা বিকৃতি। এতে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহিতার দাবি শিথিল হয় এবং নাগরিকরা বিভ্রান্ত হয় তাদের অধিকার ও দায়িত্ব নিয়ে।
সোশ্যাল ক্যাপিটাল গঠনের জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষা, সামাজিক আস্থা এবং সহনশীলতা— not a reactionary mob. তাই এমন বক্তব্য রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে তাৎক্ষণিক লাভ দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু, বিনিয়োগ পরিবেশ ও জনশৃঙ্খলার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
"মব মানেই সোশ্যাল ক্যাপিটাল"—এই শ্লোগান একদিন হয়তো বক্তৃতার বইয়ে জায়গা পাবে, কিন্তু এখন সময় বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার। রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—জনগণকে ক্ষমতায়ন করবে, না তাদের ক্ষোভকে বৈধতা দিয়ে একটি মব-নির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
