১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বদরগঞ্জের পদ্মপুকুর ও ঝাড়ুয়ার বিলে ঘটে গণহত্যার মর্মান্তিক ইতিহাস। পাকিস্তান আর্মি, বিহারী ও রাজাকারদের যৌথ তাণ্ডবে নিহত হয় প্রায় ১২০০ নিরীহ মানুষ।

“রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল পদ্মপুকুর, আর ঝাড়ুয়ার বিলের জল ছিল মৃত্যুর সাক্ষী” — এমনই স্মৃতিচারণ করেন মুক্তিযুদ্ধে বেঁচে ফেরা এক প্রত্যক্ষদর্শী। রংপুর জেলার দক্ষিণাংশে যমুনেশ্বরীর তীরে অবস্থিত বদরগঞ্জের পদ্মপুকুর — আজ শুধুই একটি ভৌগোলিক নাম নয়, এটি এক বর্বরতম গণহত্যার নীরব স্মৃতিস্তম্ভ।
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল এখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, বিহারী দালাল এবং রাজাকারদের সম্মিলিত হামলায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় কমপক্ষে ১২০০ বেসামরিক নারী, পুরুষ ও শিশু। এই হত্যাযজ্ঞ শুধু একটি দিনের ঘটনা নয় — এটি ছিল পূর্ব পরিকল্পিত জাতিগত নিধন অভিযানের অংশ।
রংপুর ও সৈয়দপুর অঞ্চলে পাকিস্তান আর্মির দুটি শক্তিশালী ক্যান্টনমেন্ট থাকায় ২৫ মার্চের গণহত্যার পরপরই এই অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ক্যাপ্টেন আনোয়ার, মেজর নিজাম, লে. মোখলেস ও অন্যান্য মুক্তিকামী সেনারা ফুলবাড়িতে পুনর্গঠিত হয়ে প্রতিরোধ শুরু করেন।
বদরগঞ্জে ক্যাপ্টেন আনোয়ারের নেতৃত্বে ডিফেন্স গঠন করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা পাকিস্তানি বাহিনীর গতিরোধ।
৯ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ফুলবাড়ি, খোলাহাটি ও বদরগঞ্জে তুমুল যুদ্ধ হয়। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটতে হয়। সেই শূন্যতার সুযোগেই পাকিস্তান আর্মি শুরু করে বেসামরিকদের উপর নির্মম প্রতিশোধ।
বিহারী নেতা বাচ্চু খান ও কামরুজ্জামান পার্বতীপুর থেকে ট্রেনে করে এবং এটিএম আজহার রংপুর থেকে মিছিল সহকারে নিয়ে আসে সেনাবাহিনী। রামনাথপুর ইউনিয়ন ঘিরে ফেলে তারা। আতঙ্কে শত শত মানুষ পালিয়ে যায় ঝাড়ুয়ার বিল ও পদ্মপুকুরে। কিন্তু সেই আশ্রয়স্থলই হয়ে ওঠে মৃত্যুকূপ।
স্মৃতিচারণ করেন বদরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক মেছের উদ্দিন, যিনি নিজেও ছিলেন সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হন। তিনি বলেন, “লাশের গন্ধ, আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, আর পদ্মপুকুরের লাল পানি — এসব কোনোদিন ভোলা যায় না।”
ঘাতকরা শুধু হত্যায় থেমে থাকেনি। তারা ধরে নেয় ২০০ তরুণকে। এদের মধ্যে অধিকাংশের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
এটা নিছক গণহত্যা নয় — এটি ছিল একটি জাতিকে নিধন করে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার প্রচেষ্টা।
ঘাতকদের মধ্যে এটিএম আজহার পরবর্তীতে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। একসময় ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি থেকে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা হয়ে ওঠেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের রায় দেয়।
এই হত্যাকাণ্ড আজও আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারক বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আলো পায়নি। ঝাড়ুয়ার বিল বা পদ্মপুকুরে নেই কোনো স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ। অথচ প্রতিটি রক্তবিন্দু ইতিহাসের দলিল।
পদ্মপুকুর শুধুই একটি বিল নয়, এটি এক জাগ্রত বিবেকের নাম। এই ভূমি মনে করিয়ে দেয় ইতিহাসকে ভুলে গেলে কিভাবে অন্যায় আবার ফিরে আসে। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মারক নির্মাণ, পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি এবং গণহত্যা দিবসে পদ্মপুকুর গণহত্যাকে স্মরণ করা আজ সময়ের দাবি।
আমরা যদি স্মৃতি হারাই, তবে ইতিহাস মুছে যায়। আর ইতিহাস মুছে গেলে পদ্মপুকুরে রক্তপাত থেমে গেলেও তা মানুষের চেতনায় চলতেই থাকবে।
