১৪ বছর পর মুক্তি পাওয়া যুদ্ধাপরাধী এটিএম আজহারুল ইসলামের শাহবাগে বিতর্কিত বক্তব্য আবারো যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে জাতিকে ভাবিয়ে তুলেছে। এটি কি বিচারব্যবস্থার বিপরীতে কোনো বার্তা?

১৪ বছর জেল খেটে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম মুক্তি পেলেন। কিন্তু সেটিই কি শেষ কথা? শাহবাগে এসে ‘বিচারের নামে হত্যা’ বলার মাধ্যমে তিনি যেন নতুন করে একটি ‘বিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করলেন এবং এই ঘোষণার স্থান হিসেবে বেছে নিলেন সেই শাহবাগ, যে জায়গাটি ২০১৩ সালে লাখো মানুষের “গণজাগরণ” দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিল।
আজহারুলের বক্তব্য শুধু বিতর্কিত নয়, বরং এটি একটি চ্যালেঞ্জ—যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জাতীয় সংবেদনশীলতার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, “যাদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছে, তাদের হত্যা করা হয়েছে।” এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একাত্তরের বিচারপ্রক্রিয়াকে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেন, যা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে সরাসরি অপমান।
একটি প্রশ্ন আজ বড় হয়ে সামনে আসে—এই বক্তব্য কি কেবল একজন মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত অভিমত?
নাকি এর পেছনে রয়েছে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক ছায়া, যে ছায়া দীর্ঘদিন ধরে ঘাপটি মেরে ছিল, সুযোগের অপেক্ষায়?
২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের মুখ্য দাবি ছিল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি। আজ সেই একই স্থানে দাঁড়িয়ে একজন মুক্তিপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীর এমন বক্তব্য মানে কি ওই জনগণের চেতনাকে চ্যালেঞ্জ জানানো? এটি কি ২০১৩-র শাহবাগ আন্দোলনের প্রতি প্রতিশোধমূলক বার্তা নয়?
মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পাওয়ার পর এটি পরিষ্কার নয় যে, আদালতের যুক্তিতর্কে তিনি কীভাবে বেকসুর প্রমাণিত হলেন।
কিন্তু খালাস পাওয়া মানেই কি নির্দোষ? নাকি রাজনৈতিক পালাবদলের হাওয়ায় কিছু শক্তি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে?
বর্তমানে বাংলাদেশে অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সহানুভূতিশীল রাজনৈতিক গোষ্ঠী আবারো সক্রিয় হয়েছে।
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি সমাজ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার বিষয়। যদি একজন যুদ্ধাপরাধী মুক্ত হয়ে এসে শাহবাগে দাঁড়িয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে “হত্যা” বলেন এবং তাতে রাষ্ট্র নিশ্চুপ থাকে, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ বার্তা হতে পারে।
এটিএম আজহারুলের এই বক্তব্য শুধু রাজনীতি নয়; এটি জাতির ঐতিহাসিক চেতনার ওপরও সরাসরি আঘাত। “রাজাকারদের প্রতি সহানুভূতি” রাখার অভিযোগে ইতিপূর্বেও সমালোচিত হয়েছে কিছু রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বক্তব্যের পর সরকারের নিরবতা অনেক বড় প্রশ্নের জন্ম দেবে। এটি ভবিষ্যতে সামাজিক মেরুকরণ ও নতুন উত্তেজনার উৎস হয়ে উঠতে পারে।
একজন যুদ্ধাপরাধী যখন শাহবাগে এসে বিচারপ্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন, তখন সেটি নিছক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়—বরং এটি একটি সাংঘাতিক বার্তা।
বিচারপ্রক্রিয়া ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধে যে কৌশলে যুদ্ধাপরাধীরা নতুন কৌশলে মাঠে নেমেছে, তা রাষ্ট্র ও জাতির জন্য গভীর ভাবনার বিষয়।
এখানে প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্র কি এই বার্তার জবাব দেবে? নাকি নীরবতা দিয়ে যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসকে ধ্বংস করে দেবে?
