এনবিআর বিভাজন ইস্যু ও শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারজট সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের ছুটিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সরবরাহ শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরে ফের দেখা দিয়েছে কনটেইনারজট। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভাজন ইস্যুতে কর্মবিরতি এবং প্রাইম মুভার চালক-শ্রমিকদের ধর্মঘটের ফলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদুল আজহার আগে ১০ দিনের ছুটি এবং ক্রমবর্ধমান জট পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ব্যবস্থা না নিলে সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে।
📦 বন্দরে কনটেইনার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ছাড়িয়ে
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ধারণক্ষমতা ৫৩,৫১৮ টিইইউএস হলেও, গতকাল (মঙ্গলবার) সেখানে ৪৫,৩৭৭ টিইইউএস কনটেইনার জমা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাভাবিক অপারেশন বজায় রাখতে হলে কমপক্ষে ৩০% জায়গা ফাঁকা রাখা উচিত, অর্থাৎ ৩৮-৪০ হাজার টিইইউএস আদর্শ সীমা।
গত ১১ মে যেখানে কনটেইনার সংখ্যা ছিল ৩৬,৮০৯ টিইইউএস, সেখানে ১৫ দিনের ব্যবধানে তা বেড়ে গেছে প্রায় ৮,৫০০ টিইইউএস।
⚠️ ক্ষতির ধাক্কা: জাহাজজট, বিলম্ব ও অতিরিক্ত ব্যয়
চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মনসুরুল আমিন রিয়াজ বলেন,
“এরই মধ্যে অনেক পণ্য আটকে গেছে। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ধাক্কা লেগেছে। ব্যবসায়ীরা ডেলিভারি না নিতে পারায় চার গুণ হারে স্টোর রেন্ট গুনতে হচ্ছে।”
জানা গেছে, কনটেইনারজট থাকলে জাহাজ থেকে মাল নামাতে বিলম্ব হয়, ফলে জাহাজকে অতিরিক্ত সময় বন্দরে থাকতে হয়—প্রতিদিন প্রায় ১০,০০০ মার্কিন ডলার খরচ করে। এর ফলে বন্দরের গড় জাহাজ অবস্থানকাল বেড়ে যায়, যা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নেতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।
📉 এনবিআর বিভাজন ইস্যু থেকেই শুরু বিপত্তি
১৫ মে থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাঁচ দিন ধরে কলমবিরতি পালন করেন। একই সময়ে প্রাইম মুভার চালকদের এক দিনের ধর্মঘটও চলেছে। এই দুই দফা কর্মবিরতির কারণে ডেলিভারি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
🛠️ কর্তৃপক্ষের আশ্বাস: ঈদেও চলবে কাজ
চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিন বলেন,
“ডেলিভারি বাড়ছে, ঈদের ছুটিতেও বন্দর খোলা থাকবে। কনটেইনারজট থাকলেও এই মুহূর্তে জাহাজজট নেই।”
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, যদি পণ্য খালাস দ্রুততর না করা যায়, তাহলে জাহাজজট এড়ানো সম্ভব হবে না।
🧠 বিশ্লেষণ: সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত অস্থিরতা বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক স্তরে সমন্বয়হীনতা ও নীতিগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে:
- এনবিআর বিভাজন ইস্যুতে সময়মতো সমাধান না হওয়া
- কাস্টম ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে অপ্রতুল আলোচনার ফল
- বন্দরের জায়গা ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়নহীনতা
- ঈদের মতো ছুটির সময়ে বিকল্প লজিস্টিক প্ল্যান না থাকা
চট্টগ্রাম বন্দর যেমন দেশের ৭০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র, তেমনি এটি আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতার প্রতীক। এ ধরনের জট বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারজট একটি ব্যবস্থাপনা সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদি দ্রুত সমাধান না আসে, তাহলে শুধু আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যই নয়, পণ্যমূল্য, সরবরাহ চেইন এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি হবে।
