চট্টগ্রাম বন্দরে শুল্কায়ন কার্যক্রম বন্ধ ও ঈদুল আযহার দীর্ঘ ছুটির প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষণ। শিল্প ও রপ্তানি খাত পড়েছে বড় সংকটে।

চট্টগ্রাম বন্দর—যে প্রতিষ্ঠানটি দেশের আমদানি-রপ্তানির মূল কেন্দ্র, বর্তমানে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্তির প্রতিবাদে কাস্টমস কর্মকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি এবং বন্দরের শ্রমিক আন্দোলনের রেশ না কাটতেই সামনে হাজির ঈদুল আযহার দীর্ঘ ১০ দিনের ছুটি। একাধিক দিক থেকে চাপে পড়া এই বন্দর ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো এখন সংকটের সাগরে ভাসছে।
১৪ মে থেকে শুরু হওয়া কাস্টমস কর্মবিরতির কারণে বন্দরে শুল্কায়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বন্দরে আটকে পড়া কনটেইনারের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। নিয়মিত খালাস না হওয়ার কারণে কনটেইনারের ওপর ড্যামারেজ ফি (জরিমানা) বেড়েই চলেছে। একাধিক শিপিং এজেন্ট জানিয়েছে, আগে যেখানে দিনে ১০–২০ ডলার লাগত, এখন সেখানে ৭ দিনের পর প্রতিদিন ৯৬ ডলার পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। এটা শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ভয়াবহ এক আর্থিক চাপ।
বিশেষ করে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস খাত এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। বিজিএমইএ-এর তথ্যমতে, গার্মেন্টস খাত থেকে দেশের প্রতি মাসে গড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় আসে। কিন্তু এখন একটি বোতাম, একটি লেবেল বা হ্যাংগার দেরি করলেই পুরো অর্ডার ঝুঁকিতে পড়ছে।
প্যাসিফিক জিনস, বিএসআরএম, প্রিমিয়ার সিমেন্ট—এমন বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান কাঁচামাল না পেয়ে উৎপাদন স্থগিত রেখেছে। শুধু উৎপাদনই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা হারানোর শঙ্কাও বাড়ছে।
কনটেইনার জমে যাওয়ায় শিপিং কোম্পানিগুলো যেমন এমএসসি বাংলাদেশ তাদের অপারেশনে সমস্যা অনুভব করছে। তাদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে জাহাজগুলো নিয়মিতভাবে লোড-আনলোড করতে পারবে না, ফলে ভবিষ্যতে তারা বাংলাদেশকে এড়িয়ে চলতে পারে। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দরের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারানোর আশঙ্কাও দেখা দিচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে ৪০ লাখ ডলারের সরাসরি ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। স্টোরেজ খরচ, বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিকের অব্যবহৃত শ্রমঘণ্টা—সব মিলিয়ে ক্ষতির অঙ্ক আরও কয়েকগুণ বেশি। অনেক প্রতিষ্ঠান ঈদের পর এসব ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
বিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ—সব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেই সরকারকে আহ্বান জানানো হয়েছে ঈদের ছুটিতে অন্তত কাস্টমস, ব্যাংক ও বন্ড অফিস সীমিত আকারে খোলা রাখার জন্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি মাহমুদ হাসান বলেছেন, “এই অচলাবস্থার ক্ষতি যদি কমাতে হয়, তাহলে জরুরি ভিত্তিতে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবস্থা সাময়িক সমস্যা নয়। এটি প্রশাসনিক অদক্ষতা, কর্মপরিকল্পনার অভাব ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। একটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর যদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্ধ থাকে, তবে সে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এক সময় বিপর্যস্ত হতেই বাধ্য।
এখনই সময়—সরকার, রাজস্ব বোর্ড, শ্রমিক সংগঠন ও ব্যবসায়ী মহল এক টেবিলে বসে এই অচলাবস্থার দ্রুত এবং টেকসই সমাধান খুঁজে বের করে। নইলে শুধু বন্দর নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিই ভেঙে পড়বে।
