সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে আটক প্রবাসীদের মুক্তির দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে মিছিল। সরকারের নিষ্ক্রিয়তার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিদেশফেরত বিক্ষুব্ধ প্রবাসীরা।
‘জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ইতিহাসে কীভাবে লেখা হবে তা সময় বলে দেবে, কিন্তু ইতোমধ্যেই এই আন্দোলন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এর জের ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীরা যে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তা এক ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছে।
তাদের মুক্তির দাবিতে বিদেশফেরত প্রবাসীরা সম্প্রতি যমুনা, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন অভিমুখে একটি প্রতীকী মিছিল করেন। তবে এই শান্তিপূর্ণ মিছিলকেও বাধা দিয়েছে পুলিশ, যা বর্তমান সরকারের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনাবোধের ভয়াবহ দূরদর্শন উদঘাটন করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদান অপরিসীম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রেমিট্যান্স এসেছে—যার বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমজীবী প্রবাসীদের ঘামে অর্জিত। অথচ, যখন এই প্রবাসীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একাত্মতা প্রকাশ করে, তখন তাদের প্রতি সরকারের ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায় নির্লজ্জ নিষ্ক্রিয়তা।
আল সদর কারাগারে এখনো ২৫ জন বাংলাদেশি প্রবাসী আটক। আরব আমিরাতে গ্রেফতার হওয়া ১৮৮ জনের মধ্যে অনেকেই মুক্তি পেলেও বাকি প্রবাসীদের জন্য কোনো কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
অথচ এর আগে শেখ হাসিনার সরকার বিদেশে দণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে এনেছিল ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—বর্তমান সরকারের চোখ এতটা নিষ্প্রভ কেন?
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের প্রেস সচিব দাবি করেছেন, তিনি ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলে ৫৭ জন প্রবাসীর মুক্তির ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু আন্দোলনরত প্রবাসীদের মতে, এই প্রচেষ্টা ছিল অর্ধেক সাফল্য, পূর্ণ চেষ্টার কোনো ছাপ নেই।
যেখানে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন, সেখানে ইউনূস প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ‘ডেডিকেটেড টাস্কফোর্স’, বিশেষ দূত, বা মানবিক টিম পাঠানোর উদ্যোগ নেই। এই পরিস্থিতি প্রশ্ন তোলে—ড. ইউনূস কি কেবল আন্তর্জাতিক বাহবা কুড়াতে ব্যস্ত, নাকি বাস্তব সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাওয়াতেই তার অভ্যস্ততা?
এই প্রবাসীরা শুধু বিদেশে কাজ করেই নয়, গণতন্ত্রের পক্ষে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশ করে একটি মূল্যবান অবস্থান নিয়েছেন। তাদের ‘জুলাই প্রবাসী যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
তাদের জন্য পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে আর কোনো প্রবাসী এভাবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস পাবে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু নিরাপত্তা বা পররাষ্ট্রনীতি চালানো নয়, বরং যারা দেশের অর্থনীতির হাল ধরে রেখেছে, তাদের বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোই আসল রাষ্ট্রচিন্তার বহিঃপ্রকাশ। আজ যদি এই প্রবাসীরা অবহেলিত হন, তাহলে আগামীকাল দেশেরই ক্ষতি হবে।
সরকারের উচিত অবিলম্বে বিশেষ দূত পাঠিয়ে, বন্দীদের আইনি সহায়তা দিয়ে, সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা করে বাকি প্রবাসীদের মুক্তি নিশ্চিত করা। না হলে, এই যন্ত্রণাক্লিষ্ট প্রবাসী জনগোষ্ঠীর রাগ একদিন সামাজিক বিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে।
