বরিশালে মহাসড়কের পাশে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় এক এসিডদগ্ধ নারীকে জীবিত উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই বর্বর ঘটনার পেছনের কারণ অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। বিশ্লেষণ তুলে ধরছে সামাজিক নিরাপত্তা ও সহিংসতার বাস্তবতা।
ভোরের আলো ফোটার আগেই বরিশাল-ভোলা মহাসড়কের তালুকদারহাট এলাকায় দেখা গেলো এক নারীর জীবনের জন্য আকুতি। পলিথিনে মোড়ানো, হাত-পা বাঁধা, দেহের বিভিন্ন অংশ এসিডে ঝলসে যাওয়া – এই দৃশ্য শুধু একটি অপরাধের নয়, এটি এক নিষ্ঠুর, অমানবিক সমাজ বাস্তবতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
২৯ জুন, রোববার ভোরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রথম দেখতে পান অদ্ভুত নড়াচড়া। কাছে গিয়ে তারা যা দেখলেন, তাতে স্তব্ধ হয়ে যান—এক নারী বেঁচে আছেন, অথচ তাকে মৃত ভেবে মহাসড়কের পাশে ফেলে যাওয়া হয়েছে। তার শরীর পোড়া, গায়ে সাদা পলিথিন, রক্ত-মাংস গলগল করছে।
দ্রুত খবর দেয়া হয় পুলিশকে। বন্দর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে ভর্তি করে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে।
এই প্রশ্নগুলোই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সমাজে। এখনো ওই নারীর নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি পরিকল্পিতভাবে নারীর ওপর সংঘটিত একটি এসিড-সন্ত্রাস। বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার ভয়ংকরতম রূপগুলোর একটি হলো এসিড নিক্ষেপ। প্রেমে প্রত্যাখ্যান, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, সম্পত্তির লোভ কিংবা পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্য – এসিড সন্ত্রাসের পেছনে থাকে সমাজের গভীর ব্যর্থতা।
বন্দর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং দায়ীদের খুঁজে বের করতে সব ধরনের চেষ্টা চলছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নারীর অবস্থা গুরুতর, তবে তিনি আশঙ্কামুক্ত নন।
যখন একটি সমাজে নারীকে এভাবে নির্যাতন করে মহাসড়কের পাশে পলিথিনে ফেলে রাখা হয়, তখন প্রশ্ন আসে—আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে? এসিড সন্ত্রাস রোধে ২০০২ সালের পর বাংলাদেশে আইন প্রণয়ন হলেও তা কি যথাযথভাবে কার্যকর হয়েছে? নাকি কিছু ‘নিরাপত্তাহীন পুরুষতন্ত্র’ এখনো নারীর অস্তিত্বকে ধ্বংস করতেই উঠে-পড়ে লেগেছে?
এই ঘটনাটি শুধু অপরাধ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীকও। এসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধে আইন আছে, বিচারব্যবস্থা আছে, তবুও এ ধরনের নৃশংসতা কি করে ঘটছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে রাষ্ট্রকে, সমাজকে এবং আমাদের সকলকেই।
এই নারী বেঁচে আছেন—এটাই আপাত শান্তি। তবে সমাজ কীভাবে তাকে বাঁচাবে, কীভাবে তার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব করবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন আমাদের সকলকে দিতে হবে। কারণ এই ঘটনা একক কোনো নারীর নয়—এটি বাংলাদেশের নারী নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত পরীক্ষা।
