বিশেষ প্রতিবেদনঃ ২২ অক্টোবর ১৯৬৯।
১৯৬৯ সালের ২২ অক্টোবরে গৃহীত ও পরদিন ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত; এই সাক্ষাৎকারটির গ্রহীতার নাম জানা যায়নি। ‘লন্ডনপ্রবাসী ভাইদের শ্রদ্ধা জানাইতে যাইতেছি’ শিরোনামে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে বাইলাইনের জায়গায় লেখা ছিল ‘ইত্তেফাক প্রতিনিধি’।বঙ্গবন্ধু সদ্য আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর যুক্তরাজ্যপ্রবাসী পূর্ব পাকিস্তানিদের আমন্ত্রণে তিন সপ্তাহের এক সফরে ১৯৬৯ সালের ২৫ অক্টোবর লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান। সফরের আগে ঢাকায় তাঁর এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নেন ইত্তেফাক প্রতিনিধি।
আধঘণ্টা স্থায়ী এই সাক্ষাৎকারে তিনি লন্ডন সফরের উদ্দেশ্য ও দেশের বিদ্যমান সমস্যাবলি সম্পর্কে আলোচনা করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁহার লন্ডন সফরের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বলেন যে, আইয়ুব সরকার যখন উহার এক দশকের রাজত্বের শেষ পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানিদের ন্যায্য দাবিদাওয়া আদায়ের সংগ্রামকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করিয়া দেওয়ার জন্য সম্ভাব্য সকল দিক হইতে নির্যাতন আর নিপীড়নের জাঁতাকল ভীমবেগে পরিচালিত করিয়াছিল, যখন পূর্ব পাকিস্তানের সংগ্রামী নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগ এক মহা-অসম সংগ্রামে আপোসহীনভাবে সংগ্রাম করিয়া যাইতেছিল, তখন লন্ডনের প্রবাসী পাকিস্তানিরা, বিশেষ করিয়াবাঙালিরা যেভাবে অপরিসীম সাহায্য ও সহানুভূতির হস্ত সম্প্রসারিত করিয়াছিল, সে স্মৃতি কোনো দিন ভুলিবার নয়। সুদূর প্রবাসে ৬ দফার ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে তাঁহারা স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ও শাসনকর্তার বিরুদ্ধে যে সংগ্রামের সংগঠন করিয়াছিলেন, সে সংগ্রামের হাতছানি আমাদের মনে সাড়া না দিয়া পারে না।
তিনি বলেন যে, দেশে প্রত্যাবর্তনের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়া তাঁহারা আমার, আমার দলের এবং পূর্ব পাকিস্তানিদের চরমতম সংকটের দিনে যে দুর্জয় ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন, সে ভূমিকাকে আমি অভিনন্দন জানাই। তথ কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যেদিন আমাদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হইয়াছিল, সেদিন প্রবাসী বাঙালিদের হৃদয় কাঁদিয়া উঠিয়াছিল। তাহারা আমাদের পক্ষ সমর্থনের জন্য নিজেদের অর্থ ব্যয় করিয়া বিশিষ্ট আইনজীবী
টমাস উইলিয়ামকে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার হইতে কুর্মিটোলার বিচারকক্ষে পাঠাইয়াছিলেন। এই মমত্ববোধ আর সংগ্রামী একাত্মবোধের স্মৃতি আমাদের মানসপটে চিরজাগরূক থাকিবে। সেদিনও প্রবাসী বন্ধুরা আওয়ামী লীগের বাত্যাদুর্গত সাহায্য তহবিলে ৫৬০০ টাকা প্রেরণ করিয়াছেন।
শেখ সাহেব বলেন যে, আমার মুক্তির পর হইতে লন্ডনের সেই সংবেদনশীল ভাইরা আমাকে তাঁহাদের মধ্যে পাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাইয়া অগণিত পত্র লিখিয়াছেন, তারবার্তা প্রেরণ করিয়াছেন। তাহাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং তাঁহাদের সংগ্রামী ভূমিকার প্রতি একাত্মতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে লন্ডন যাওয়া আমি কর্তব্য বলিয়া বিবেচনা করি। বিগতকালের ব্যস্ততার ফলে আমার লন্ডন যাত্রা বিলম্বিত হইয়াছে। প্রবাসী বন্ধুরা আজ দাবি তুলিয়াছেন এবং বিনয়াবনত চিত্তে আমি সে দাবি মানিয়া লইয়া তাঁহাদের কাছে যাইতেছি।
তাঁহার এই লন্ডন সফরের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক কারণ জড়িত আছে কি না জানিতে চাহিলে শেখ সাহেব বলেন, এই সফরের সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো কারণ জড়িত নাই এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য লইয়া তিনি লন্ডন যাইতেছেন না। তাঁহার বক্তব্য ব্যাখ্যা করিয়া তিনি বলেন, গোপন কারসাজি করার মধ্য দিয়া উদ্দেশ্য হাসিলের রাজনীতি আমি করি না। আমার ভূমিকা সর্বজনবিদিত এবং বহু অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ আমাদের রাজনৈতিক ভূমিকা দেশের চাষি-মজুর, ছাত্র-অছাত্র এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। এই দেশের মানুষ আমাদের রাজনৈতিক ভূমিকাকে সমুন্নত ও গরীয়ান করার জন্য রক্ত দিয়াছে, সেই রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করার শিক্ষা বা মানসিকতা আমাদের নাই।
আর একটি প্রশ্নের জবাবে শেখ সাহেব বলেন যে, লন্ডনে থাকার সময় স্বদেশের পরিস্থিতির উপর তিনি সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখিবেন। লন্ডন মাত্র ১২ ঘন্টার পথ। প্রস্তাবিত তিন সপ্তাহের এই সফরের যেকোনো পর্যায়ে দেশবাসীর পাশে আসিয়া দাঁড়াইবার প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি মুহূর্তমাত্র কালক্ষেপণ না করিয়া ছুটিয়া আসিবেন।
শেখ মুজিবুর রহমান দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাইয়া বলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায়ের সংগ্রামকালে কতকগুলি চেনা মুখ নানা রঙে, নানা ঢঙে এবং নানান বুলিতে সোচ্চার হইয়া মাতম শুরু করে। এই সব চেনা মুখ সম্পর্কে এইবার সর্বাধিক সজাগ ও সাবধান থাকিতে হইবে। তিনি বলেন যে ইহাদের স্বরূপ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময়, যুক্ত নির্বাচনের আন্দোলনের সময়, ছয় দফার আন্দোলনের সময় দেশবাসী স্পষ্টভাবে চিনিতে পারিয়াছে।
ধর্মের নামে যাহারা বেসাতি করে শেখ সাহেব তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া বলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান ধর্মপ্রাণ। ইসলাম ধর্মের ক্ষতিসাধন তাহারা কোনোক্রমেই বরদাশত করিবে না।
কিন্তু ইসলামের দোহাই দিয়া যে চেনা মুখগুলি শুধুমাত্র ছয় কোটি বাঙালি মুসলমানকে অবিরাম ধোঁকা দিয়া আসিতেছে, তাহাদেরও বঞ্চিত মানুষেরা কোনো দিন ক্ষমা করিতে পারে না।
অতি প্রগতিবাদী এবং অতি প্রতিক্রিয়াশীল এই দুই চরমপন্থী দলের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য ব্যূহ রচনা করিয়া তাহাদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রকে চিরতরে নস্যাৎ করিয়া দেওয়ার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
