ঢাকা, ১৩ এপ্রিল: দেশে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানানো হলেও, এর পরপরই শিল্পখাতে গ্যাসের দাম ৩৩% বাড়ানোয় নতুন বিনিয়োগ এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই সিদ্ধান্তকে স্ববিরোধী ও বিনিয়োগ নিরুৎসাহক বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
নতুন শিল্পের জন্য এখন প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ১০ টাকা বেশি দিতে হবে। বিদ্যমান শিল্প গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও অনুমোদিত লোডের বেশি ব্যবহার করলেই পড়তে হবে অতিরিক্ত খরচে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন,
“হঠাৎ করে এই মূল্যবৃদ্ধিতে দেশ-বিদেশে খারাপ বার্তা যাবে। নতুন বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাবেন। এতে করে দেশে শিল্প স্থাপনায় স্থবিরতা আসবে।”
তিনি আরও বলেন, গ্যাস সরবরাহ এখনো নিয়মিত নয়। প্রায়ই মিটার জিরোতে চলে আসে, ফলে ডিজেলে উৎপাদন চালাতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা অনেক প্রতিষ্ঠান বহন করতে পারছে না।
সরকারের অবস্থান
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন,
“গ্যাসের দাম বাড়ানো বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করবে না। বরং এটি একটি সিগন্যাল—গ্যাসের ঘাটতি বাড়ছে। এখন থেকে ব্যবসায়ীদের গ্যাস-এফিসিয়েন্ট প্রযুক্তি ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা উচিত।”
তিনি জানান, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ হচ্ছে ২৮০ থেকে ২৯০ কোটি ঘনফুট, অর্থাৎ এক হাজার কোটি ঘনফুটের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে সরকার এলএনজি আমদানিতে জোর দিয়েছে।
বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা
হান্নান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি এ বি এম শামসুদ্দিন বলেন,
“যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি। সরকার আগেও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা রাখতে পারেনি। এখন আবার দাম বাড়ানো হলো।”
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন,
“আগে ৩০ টাকায় গ্যাস নিয়ে নতুন শিল্প স্থাপন করাই চ্যালেঞ্জ ছিল। এখন ৪০ টাকা হলে কেউ আর বিনিয়োগে আগ্রহী থাকবে না।”
আইনি বিতর্ক ও নীতিগত সমালোচনা
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান,
“পেট্রোবাংলা গ্যাসের দাম ১৫০% বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় আমরা ৩৩% বাড়িয়েছি। এর পেছনে মন্ত্রণালয়ের প্রেসক্রিপশন ছিল না।”
নতুন ও পুরনো শিল্পে আলাদা দামে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে বৈষম্যের প্রশ্নে তিনি বলেন,
“বিইআরসি আইনের আওতায় থেকেই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নতুন বিনিয়োগ কমবে কি না, তা নজরে রাখা হবে।”
ভোক্তা অধিকার ও নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন,
“সরকার দেশকে আমদানি নির্ভর করতে চাইছে। স্থানীয়ভাবে গ্যাস উৎপাদনের কোনো আগ্রহ নেই। ফলে এলএনজির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে নতুন কারখানা স্থাপন তো দূরের কথা, পুরনো কারখানাও টিকবে না।”
পোশাক শিল্পের উদ্বেগ
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন,
“পোশাক খাত এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপ, ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট ইস্যু—সব কিছু মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এরমধ্যে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি হলে ছোট-মাঝারি কারখানাগুলো চলবে না।”
