২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদের সংখ্যা নিয়ে সরকারি গেজেট, জাতিসংঘ ও রাজনৈতিক দলগুলোর তথ্যের মধ্যে ব্যাপক অমিল। বিশ্লেষণ করছে কেন প্রকৃত সংখ্যাটি এখনো বিতর্কিত।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই অভ্যুত্থানের সময় নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি ও বেসরকারি বাহিনী এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ হারান শত শত মানুষ। তবে, এই ঘটনার এক বছরের মধ্যেও নিহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণে ব্যর্থতা দেশের জন্য এক বিব্রতকর বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি তথ্য বনাম জাতিসংঘের প্রতিবেদন
সরকারি গেজেট অনুযায়ী এখন পর্যন্ত জুলাই শহিদের সংখ্যা ৮৩৪ জন। এই সংখ্যা নির্ধারণ করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, যা ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ সালে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। একই সময়ে জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংখ্যা ৮২০+, যা সরকারের চেয়েও কম।
অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনারের (OHCHR) একটি প্রতিবেদন (প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) জানায়, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন বলে “বিশ্বাসযোগ্য উৎস” থেকে তারা অনুমান করছে। সেই রিপোর্টে বলা হয়, নিহতদের ১২-১৩ শতাংশ শিশু এবং সহস্রাধিক মানুষ আহত হন।
রাজনীতিকদের ভাষ্যে ‘মতভেদ’
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এনসিপি নেতারা কেউ বলছেন শহিদের সংখ্যা ১০০০+, কেউ বলছেন ১৪০০+, আবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তথ্য অনুযায়ী সংখ্যা ১৫৮১ জন (তাদের মতে সংখ্যাটি চূড়ান্ত নয়)। সরকারপন্থী কোনো সংস্থা এখনো এই সমস্ত সংখ্যার স্বাধীন যাচাই সম্পন্ন করতে পারেনি।
উপদেষ্টার দ্বৈত ভূমিকা?
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জাতিসংঘের ১৪০০ সংখ্যাকে তথ্যসূত্র হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “আই অ্যাম টকিং অ্যাবাউট ইউএন রিপোর্ট।” অথচ, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অনুগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলুন।”
সরকারি একজন উপদেষ্টা যখন জাতিসংঘের অনুমিত সংখ্যার উপর নির্ভর করেন, তখন প্রশ্ন ওঠে—সরকার নিজেরাই কি ঘটনাটি তদন্তে পুরোপুরি ব্যর্থ?
মিডিয়ার কণ্ঠে হতাশা
সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল একে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, “এই আন্দোলনের ফলে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেছেন, তাদের ৮০ পার্সেন্টের এই আন্দোলনের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না।” তিনি আরও বলেন, “সরকারের উচিত ছিল জাতিসংঘের উপর না ভর করে নিজেরাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সংখ্যাটি নির্ধারণ করা।”
কেন জরুরি সুনির্দিষ্ট সংখ্যা?
সরকারি কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, “এই সংখ্যাটা সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন।” সঠিক তালিকা ছাড়া শহিদদের পরিবারদের জন্য ক্ষতিপূরণ, বিচার এবং ঐতিহাসিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এছাড়া, বিভ্রান্তিকর সংখ্যা ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক পক্ষ যদি সুবিধা নিতে চায়, তাহলে পুরো আন্দোলনের মূল চেতনা ও বলিদান অপমানিত হয়।
জুলাই শহিদদের প্রকৃত সংখ্যা এখনো একটি বিতর্কিত বিষয়, যা দেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তোলে। সরকার, রাজনৈতিক দল এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা—সবাই যদি আলাদা আলাদা সংখ্যা বলে, তবে প্রশ্ন থাকে—কার সত্যটা সত্য?
একটি জাতির ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো স্মৃতির সত্যতা। সেই সত্যকে খুঁজে বের করাই এখন ইতিহাসের দাবি।
