আওয়ামীলীগ নিষিদ্ধ করার আহ্বান ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, এটি পাকিস্তানি সামরিকতন্ত্রের নতুন কৌশল। বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধে ব্যবহারের ভয়াবহ পরিকল্পনা এখনো সক্রিয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সম্প্রতি একটি উদ্বেগজনক এবং অদ্ভুত আহ্বান শোনা যাচ্ছে— আওয়ামীলীগ নিষিদ্ধ করার দাবি। এই দাবি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়, এটি আসলে একটি বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ। ইতিহাসের আলোকে এই দাবির মূলে রয়েছে পাকিস্তানি সামরিক ও আদর্শিক গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, যা সময়ের ব্যবধানে নতুন রূপে আবির্ভূত হচ্ছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিল সেই ষড়যন্ত্রের সূচনাপর্ব। পরবর্তী কয়েক দশক জুড়ে বাংলাদেশে সামরিক শাসন, ছদ্মবেশী কর্তৃত্ববাদ এবং পাকিস্তানপন্থী শক্তির সক্রিয়তা সেই প্রক্রিয়াকে জিইয়ে রেখেছে। আজ ‘নিরপেক্ষতা’ কিংবা তথাকথিত ‘নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র মোড়কে আবার সেই পুরনো খেলা খেলতে নেমেছে জামাত-শিবির ও তাদের ছদ্মনামে সংগঠিত এনসিপি (NCP)-এর মতো গোষ্ঠী।
বাংলাদেশকে ছায়াযুদ্ধে জড়াতে পাকিস্তানের পরিকল্পনা
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। কিন্তু পাকিস্তান আজ যেভাবে বাংলাদেশকে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে তাদের আঞ্চলিক দ্বন্দ্বে জড়াতে চাইছে, তা শুধু কূটনৈতিকভাবে নয়, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক। পাকিস্তানের লক্ষ্য—বাংলাদেশকে ভারতের বিরুদ্ধে একটি ছায়াযুদ্ধের মঞ্চে রূপান্তর করা। এজন্য তারা কিছু ‘প্রগতিশীল’ ও ‘রাজনৈতিক বিকল্প’ নামধারী গোষ্ঠীর মাধ্যমে ভারতবিরোধী মনোভাব উস্কে দিচ্ছে।
এখানে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আমরা কি আমাদের স্বাধীনতা ও উন্নয়ন পথকে জলাঞ্জলি দিয়ে পরাজিত একটি সামরিকতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনা গ্রহণ করব?
ইতিহাস, উন্নয়ন ও বন্ধুত্ব—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন নয়
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিছক ভৌগোলিক নয়; এটি রক্তের, আত্মত্যাগের এবং ইতিহাসের সম্পর্ক। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে ভারতের সমর্থন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ে একটি অনস্বীকার্য অবদান। আজ সেই সম্পর্ক উন্নয়ন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় একটি দৃঢ় মঞ্চ গড়ে তুলেছে।
অবশ্যই, সম্পর্কের মাঝে মতভেদ থাকবে। কিন্তু মতভেদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় কৌশল পরিবর্তন কিংবা কোনো গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে যুক্ত হওয়া জাতীয় স্বার্থ বিরোধী। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার মতো কল্পনাপ্রসূত আহ্বান তাই শুধু রাজনৈতিক অসততা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি অশনি সংকেত।
বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ: কোনো বিদেশি এজেন্ডার কেন্দ্র নয়
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল একটি স্বনির্ভর, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশ কখনো কোনো বিদেশি শক্তির পেছনে দাঁড়িয়ে তাদের ভূ-রাজনৈতিক খেলায় অংশ নেবে না। আজ সময় এসেছে পুনরায় মনে করিয়ে দেওয়ার—বাংলাদেশ কারো খেলার মাঠ নয়। যারা পাকিস্তানি আদর্শে বিশ্বাস করে, তারা আমাদের ইতিহাসকে অপমান করছে, এবং জনগণের সচেতনতার মুখে তাদের মুখোশ খুলে পড়বেই।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার মত দাবিগুলো নিছক মত প্রকাশ নয়, বরং একটি গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত। পাকিস্তানি প্রেতচেতনার এই নতুন রূপ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখনই প্রয়োজন সচেতনতা, বিশ্লেষণ, এবং একটিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে বলা—বাংলাদেশ কারো পুতুল নয়।
