গাভী নিয়ে গেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা, বাছুর কোলে নিয়ে আদালতে হাজির নারী। দেনা-পাওনার জটিলতায় ন্যায়বিচারের খোঁজে নার্গিস আক্তারের এই ঘটনা বাংলাদেশে নারীর নিরাপত্তা ও আইনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।

ঝালকাঠি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আঙিনায় বুধবার (১৪ মে) এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের জন্ম হয়। কোলে এক মাস বয়সী বাছুর, হাতে দুধের বোতল, চোখে অনিশ্চয়তা আর বুকে ন্যায়বোধের আকুতি—এভাবেই হাজির হন এক নির্যাতিত নারী, নার্গিস আক্তার।
ঘটনার সূত্রপাত পারিবারিক দেনা-পাওনা নিয়ে। নার্গিসের স্বামী আবু বকরের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা পাওনা দাবি করে স্থানীয় বিএনপি নেতা বেলাল খান। সেই পাওনা আদায়ে আইনগত পদক্ষেপ না নিয়ে, সরাসরি নার্গিসের দুধেল গাভীটি বাড়ি থেকে নিয়ে যান তিনি। ফলে মায়ের দুধ না পেয়ে বাছুরটি অসুস্থ হয়ে পড়ে।
এমন মানবিক বিপর্যয়ের মুখে নার্গিস বাছুরটি কোলে নিয়ে হাজির হন আদালতে, ন্যায়বিচারের আশায়। আদালতের পাশে বসে তিনি বোতলে করে দুধ খাওয়াচ্ছিলেন ছোট্ট বাছুরটিকে—যার প্রকৃত খাদ্য হচ্ছে তার গাভী মায়ের দুধ।
এই ঘটনা যেন আমাদের সমাজের বহুমাত্রিক সংকটের প্রতিচ্ছবি—রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, আইনের অপপ্রয়োগ, নারীর আর্থিক অবস্থা, এবং দুর্বলদের প্রতি ক্ষমতাশালীদের চাপিয়ে দেওয়া নির্যাতনের এক যৌথ চিত্র।
নার্গিস একজন গার্মেন্টস কর্মী। বহু কষ্টে টাকা জমিয়ে কিনেছিলেন গাভীটি, যা তার সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস। এমন আত্মনির্ভরশীলতার প্রতি প্রতিদান হিসেবে যে আচরণ পেলেন, তা আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বেলাল খান জানান, নয় বছর আগে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প থেকে আবু বকরকে ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। সুদে আসলে তা নাকি এখন ৩০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। অথচ বিষয়টি কোনো লিখিত চুক্তি কিংবা আদালতের মাধ্যমে না তুলে, গরু কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত—এটা কতটা ন্যায়সংগত?
বিষয়টি আদালতে মামলা আকারে গড়ায়নি। স্থানীয়দের মধ্যস্থতায় নার্গিসকে তার বাছুরটিকে নিয়ে মা গরুর দুধ খাওয়াতে পাঠানো হয় বেলাল খানের বাড়িতে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এটাই কি বিচারপ্রক্রিয়ার আদর্শ রূপ? দেনা-পাওনার সমাধান কি এভাবেই হওয়া উচিত?
এটি নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এমন অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিন ঘটে চলে, যার অধিকাংশই জনসম্মুখে আসে না। আইনের আশ্রয়ে না গিয়ে ব্যক্তিগত ক্ষমতার বলে মানুষ বিচার নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে—এটাই বড় উদ্বেগ।
এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, নারীর আর্থিক স্বাধীনতা এখনো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। একইসঙ্গে এটি একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে—স্থানীয় রাজনীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সাধারণ মানুষের জীবনে কেমন বিভীষিকা হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের উচিত এ ধরনের ঘটনার পেছনে কার্যকর তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
একটি নারী যখন গাভীর বাছুর কোলে নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন, তখন সেটি শুধুই একটি পারিবারিক সমস্যা নয়—বরং তা রাষ্ট্রের নৈতিক কাঠামোর প্রতিফলনও বটে।
