একাত্তরের স্বাধীনতা ও ৩০ লক্ষ শহীদের সংখ্যা অস্বীকারকারীরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে তারা পাকিস্তানি এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে, এদের বিচার অতীব জরুরি।
বাংলাদেশের জন্মভূমি রক্তে রঞ্জিত। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত প্রতিরোধ, যার ফলে আমরা পেয়েছিলাম আমাদের বহু কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়, এটি জাতিসত্তার প্রতিষ্ঠা, ভাষার মর্যাদা, এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্বীকৃতির ফল।
কিন্তু আজও যখন কেউ বলেন, “এ দেশ স্বাধীন হয়েছে ইসলামের জন্যে—১৯৪৭ সালে”, এবং মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদকে “পাগলের বিশ্বাস” বলে অবজ্ঞা করেন, তখন প্রশ্ন জাগে—এই ব্যক্তি কি কেবল ইতিহাস বিকৃত করছেন, নাকি তিনি সরাসরি রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধে লিপ্ত?
যে ব্যক্তি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেন, তিনি আসলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব এবং পাকিস্তানি ভাবধারাকেই পুনর্জীবিত করার চেষ্টা করছেন। এই প্রবণতা কেবল মতাদর্শিক বিভ্রান্তি নয়, এটি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।
আজ যদি কেউ মনে করেন আইয়ুব খান বা ইয়াহিয়া খান তাদের “দাদা”, তবে সে জাতির নয়, বরং পাকিস্তানের দাসত্ব চায়। এরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান, ইতিহাস, এবং আত্মপরিচয়ের পরিপন্থী।
বাংলাদেশে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস অস্বীকার বা বিকৃতির” বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে আইন পাস হয়েছে। এই আইনের আওতায় যেকোনো ধরনের ইতিহাস বিকৃতি, বিশেষ করে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে কটাক্ষ বা অস্বীকৃতি, শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
এক্ষেত্রে, যিনি বলেছেন—“মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ পাগলেও বিশ্বাস করবে না”, তিনি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছেন। রাষ্ট্র চাইলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, ইতিহাস বিকৃতি, এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানির অভিযোগে মামলা করতে পারে।
বাংলাদেশ কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়। আমাদের পরিচয় “বাঙালি” হিসেবে, আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, আমাদের ভিত্তি ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র। ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান, এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ—এই দুটি ভিন্ন ইতিহাস, ভিন্ন দর্শন, ভিন্ন ভবিষ্যৎ।
যারা এই পার্থক্য মুছে দিতে চায়, তারা আসলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানোর মানসিকতা লালন করছে।
ড. ইউনূস হোক বা অন্য কেউ, যদি তারা একাত্তরের শহীদদের ত্যাগ ও জাতির আত্মত্যাগকে উপহাস করেন, তবে তাদের বিচারের মুখোমুখি করাই হবে শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন। এদের বিচার মানেই, জাতির চেতনার বিজয়।
ইতিহাস ভুলে গেলে ইতিহাস প্রতিশোধ নেয়। তাই একাত্তরের ইতিহাস অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
