বিডার নতুন চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর নানা প্রচারণার মধ্যেও বিনিয়োগ পরিস্থিতি অবনতির দিকে। বিদেশি বিনিয়োগ, মূলধনি যন্ত্র আমদানি ও বিনিয়োগ প্রস্তাব—সবই নিম্নমুখী। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে বাস্তবতা ভিন্ন।

গত সাত মাস ধরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী যেন একটি ‘ম্যাজিক শো’ পরিচালনা করছেন। দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি একের পর এক সম্মেলন, বিদেশ সফর, সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক ও বিজনেস এক্সপো আয়োজন করছেন। এসব আয়োজনের সামাজিক মাধ্যম কাভারেজ, সংবাদমাধ্যমে হেডলাইন এবং রাজনৈতিক মহলের প্রশংসা যেন প্রচারণার এক কারিশমা তৈরি করেছে—যা একাংশ ‘আশিক ম্যাজিক’ বলেই আখ্যা দিচ্ছেন।
কিন্তু এই ম্যাজিকের আড়ালে বিনিয়োগের বাস্তব সূচকগুলো কী বলছে?
📉 বিনিয়োগ প্রস্তাবে ধস
বিডার নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম দুই প্রান্তিকে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবের সংখ্যা ও আর্থিক মূল্য দুই-ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৩ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে যেখানে বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল প্রায় ২.৫ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫-এর প্রথম প্রান্তিকে তা নেমে এসেছে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলারে।
📉 এফডিআই প্রবাহের নিম্নগতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে নিট এফডিআই (FDI) প্রবাহ কমেছে প্রায় ১৮%। সবচেয়ে বড় পতন এসেছে জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ ও উৎপাদন খাতে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা প্রভাব ফেললেও দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নীতির অস্থিরতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উদ্বেগ বেশি দায়ী।
📉 মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে স্থবিরতা
বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বাভাসমূলক সূচক হলো মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি। ২০২৫-এর প্রথম চার মাসে এই খাতে আমদানির হার কমেছে প্রায় ২২%—যা ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও শিল্পায়নের গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
‘স্কাইডাইভ টু বিনিয়োগ’: বাস্তবতা বনাম প্রচারণা
আশিক চৌধুরীর একটি বহুল প্রচারিত কার্যক্রম হলো দুবাইয়ে স্কাইডাইভ করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আহ্বান। এই দৃষ্টিনন্দন ও ব্যতিক্রমী প্রচারণা কৌশল সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলেও বিনিয়োগের হিসেবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। বাস্তবে কোনো চুক্তি কিংবা উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ ধরা পড়েনি বিডার তথ্যভাণ্ডারে। অনেকে তাই একে বলছেন “স্কাইডাইভ টু মিডিয়া কভারেজ”, বিনিয়োগে নয়।
বিডার সাবেক চেয়ারম্যান স্যার আজিজুল ইসলাম এবং বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বানে খ্যাত অধ্যাপক ইউনুসের সময় বিনিয়োগ প্রস্তাব এবং কার্যকর বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল অনেক বেশি সুসংহত ও কাঠামোগত। সেখানে গৃহীত নীতিগুলো ছিল বাস্তবমুখী এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ভিত্তিতে পরিকল্পিত।
যেখানে আশিক চৌধুরীর নেতৃত্বে বিডা পরিণত হয়েছে একটি হাইভিশন মিডিয়া-সেন্ট্রিক প্রতিষ্ঠানে, সেখানে বিনিয়োগকারীদের বাস্তব চাহিদা—যেমন একক জানালা সেবা, দ্রুত লাইসেন্সিং, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা—এসব জায়গায় কার্যকর অগ্রগতি নেই। ব্যবসায়ী মহলের অনেকে বলছেন, “আশিক সাহেব উড়ছেন, কিন্তু বিনিয়োগ থেমে আছে।”
বাংলাদেশে বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবনের জন্য এখন দরকার প্রচারণা-নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবভিত্তিক, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে একটি সুসংহত ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট রোডম্যাপ তৈরি করা, যেখানে মিডিয়া শো নয়, থাকবে দীর্ঘমেয়াদী গঠনমূলক পদক্ষেপ।
‘আশিক ম্যাজিক’ যদি বাস্তব রূপ নিতে চায়, তবে প্রয়োজন বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং উন্নত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা। না হলে এই ম্যাজিক এক সময় বাস্তবতা নামক আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে হারিয়ে যাবে।
