বাংলাদেশের ১৪টি সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ সেবা চার মাস ধরে বন্ধ। জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতায় বেসরকারি হাসপাতালের দখলে আইসিইউ ব্যবসা। বিশ্লেষণ করলেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চিকিৎসাধীন চান্দু মিয়া যেন হয়ে উঠেছেন দেশের স্বাস্থ্যখাতের এক প্রতীকী মুখ। দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টে ভোগা এই রোগী আইসিইউ সুবিধা থেকে বঞ্চিত—কারণ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটটি চার মাস ধরে বন্ধ। এমন বাস্তবতা শুধু এই এক হাসপাতালেই নয়, সারাদেশের আরও ১৩টি সরকারি হাসপাতালে একই অবস্থা।
বাংলাদেশে আইসিইউ সেবা বর্তমানে একটি নানামুখী সংকটের মুখে। সরকারি পর্যায়ে ১৪টি হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিট বন্ধ থাকায় প্রতিদিন শতাধিক মুমূর্ষু রোগী বঞ্চিত হচ্ছেন জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলো সুযোগ নিয়ে চড়া দামে একচেটিয়া ব্যবসায় মত্ত।
২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় সরকার ৪৮টি জেলায় ১০ শয্যার আইসিইউ চালুর লক্ষ্যে ৫১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। প্রতিটি ইউনিটে গড়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা খরচ হলেও বর্তমানে জনবল না থাকায় এই ইউনিটগুলোর অনেকগুলোই বন্ধ। এমনকি ১৪৯ কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বাইরে থেকে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কভিডকালে নিয়োগপ্রাপ্ত জনবল রাজস্বখাতে স্থানান্তরের প্রস্তাব বাতিল হওয়ায় সেবা অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি। যদিও নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে, তবে তা বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ।
আইসিইউ ব্যবসার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি খাতে
সরকারি হাসপাতালের তুলনায় কম খরচে আইসিইউ সুবিধা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হলেও এখন তাদের একমাত্র ভরসা বেসরকারি হাসপাতাল। কিন্তু সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকায় মিলছে শয্যা, সাথে আলাদা চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ। একজন রোগীর জন্য দিনে কমপক্ষে ৩০-৫০ হাজার টাকা ব্যয় এখন স্বাভাবিক। ফলত, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যয়ে চূড়ান্ত আর্থিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জ, বাগেরহাট, সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন রোগী পাঠানো হচ্ছে ঢাকায়। মাসে প্রায় ৫০ জন রোগী শুধু বাগেরহাট থেকেই খুলনা বা ঢাকায় পাঠানো হয়। পথেই অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটছে। টাঙ্গাইলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ না থাকায় চার মাস ধরে আইসিইউ বন্ধ। এমনকি সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ২ বছর আগে স্থাপিত আইসিইউ এখনো চালু হয়নি।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, “আইসিইউ সেবা সচল থাকলে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা হতো। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগের অভাবে রোগীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।” বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, আইসিইউ যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বাইরে থাকলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এখনই উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে সেবাটি পুনরায় চালু করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই অব্যবস্থাপনা ও চরম গাফিলতি আমাদেরকে এক গভীর সংকেত দিচ্ছে—সঠিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি জনবল কাঠামো ও কার্যকর প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতা ছাড়া জনস্বাস্থ্য খাত টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
সরকারকে অবিলম্বে সচল করতে হবে বন্ধ আইসিইউগুলো, পুনর্গঠিত করতে হবে কভিডকালের জনবল এবং স্বাস্থ্যসেবায় ন্যূনতম মানবিকতার মানদণ্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
