‘লাখ শ্রমিক যাবে জাপান’ প্রচারণার বাস্তবতা প্রশ্নবিদ্ধ। একই সময়ে বাংলাদেশের তিনটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা—রাশিয়া, মিয়ানমার ও জাপানে রাষ্ট্রীয় হেনস্তা—আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের মর্যাদা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশে হঠাৎ করেই বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সরকারি প্রচারণায় ভেসে উঠেছে এক আশাব্যঞ্জক ঘোষণা—জাপানে যাবে লাখো শ্রমিক!
বলা হচ্ছে, প্রতিবছর ৩ হাজার শ্রমিক পাঠানো হবে জাপানে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
এটি আসলে একটি সম্পূর্ণ বেসরকারি চুক্তি, যার সাথে জাপান সরকারের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
চুক্তির আরেক দিক হলো, এটি ২০১৯ সাল থেকেই চলমান, এবং নতুন বা রাষ্ট্রীয় কোনো উদ্যোগ না।
এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ওয়াতামি গ্রুপ—ড. মোহাম্মদ ইউনূসের এক ব্যক্তিগত বন্ধু পরিচালিত একটি জাপানি মানবসম্পদ কোম্পানি।
তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, তারা বাংলাদেশ থেকে কিছু জাপানি ভাষা জানা কর্মী বাছাই করে নিয়োগ দেবে।
এতে একদিকে যেমন কোনো রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা নেই, তেমনি ‘লাখ শ্রমিক’–এর মতো ভাষা চরম বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
কূটনীতিতে তিনটি বড় ধাক্কা: বাংলাদেশের মর্যাদায় সংকট
এই ‘শ্রমিক পাঠানোর সাফল্যগাঁথা’ প্রচারণার ঠিক পাশেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদায় ঘটেছে তিনটি বড় আঘাত—যা কেবল লজ্জার নয়, বরং কূটনৈতিক ব্যর্থতার গভীর ইঙ্গিত বহন করে।
১. রাশিয়ায় রাষ্ট্রদূতের আচমকা প্রত্যাহার (স্ট্যান্ড রিলিজ)
রাশিয়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র। এমন একটি দেশে হঠাৎ রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই।
এর পেছনে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত বিতর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও, রাষ্ট্রীয়ভাবে কিছু বলা হয়নি।
এই ধরণের পদক্ষেপ কূটনৈতিক অস্থিরতা ও বিশ্বাসহীনতা নির্দেশ করে।
২. মিয়ানমারে রাষ্ট্রদূত ও সামরিক অ্যাটাশে বহিষ্কৃত
মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও সামরিক অ্যাটাশেকে Persona Non Grata ঘোষণা করে বহিষ্কার করেছে।
এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে চরম অপমানের ইঙ্গিত বহন করে, বিশেষ করে যখন রোহিঙ্গা সংকট ও সীমান্ত নিরাপত্তা হুমকির মুখে।
৩. জাপানে প্রধান উপদেষ্টার অপমানজনক অভ্যর্থনা
বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা (ড. ইউনূস) জাপান সফরে গেলে কেউ রাষ্ট্রীয়ভাবে রিসিভ করেনি।
সাধারণত রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সম্মানজনক অভ্যর্থনা জানানো হয়।
কিন্তু এবার এমন ঠান্ডা ব্যবহার প্রমাণ করে—জাপান সরকারও এই প্রতিনিধিকে গুরুত্ব দেয়নি।
প্রশ্ন উঠছে: বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি বৃহত্তর কূটনৈতিক ব্যর্থতা?
এই ঘটনাগুলোর মাঝে কি কেবল কাকতালীয় মিল, নাকি বাস্তবে এগুলো বাংলাদেশের ক্রমাগত কূটনৈতিক দুর্বলতা, ভুল নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক অবিশ্বাসের প্রতিফলন?
বিশ্লেষকেরা বলছেন—
“রাষ্ট্র যখন অগণতান্ত্রিক নেতৃত্বে চলে, কূটনীতি তখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ফলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার বদলে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যক্তির প্রচারণা।”
‘জাপানে লাখো শ্রমিক যাবে’—এই শ্লোগান যতটা বাস্তবতার নয়, তারচেয়ে বেশি রাজনৈতিক বিপর্যয় ঢাকার প্রচেষ্টা।
আর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান দিন দিন যে কতটা দুর্বল হয়ে পড়ছে, তার প্রমাণ মিলেছে রাশিয়া, মিয়ানমার ও জাপানে ঘটিত তিনটি ঘটনা থেকেই।
এখন প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে কোন পথে হাঁটছে?
প্রচারণা দিয়ে কি কূটনৈতিক মর্যাদা ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
