যেখানে চাকরির নিশ্চয়তা নেই সেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের বিশেষ প্রণোদনার হার বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আন্দোলন মোকাবেলার হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন আন্দোলনরত কর্মচারীরা।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুন মাসের শুরুতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুচর্চিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এই প্রজ্ঞাপনে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার হার বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের অতিরিক্ত ১০% এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডভুক্তরা ১৫% হারে বিশেষ প্রণোদনা পাবেন আগামী জুলাই মাস থেকে।
সরকার বলছে, এটি দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো না বদলানোর প্রেক্ষাপটে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু আন্দোলনরত সরকারি কর্মচারীরা বলছেন, এটি আন্দোলন থামানোর একটি কৌশলী ও মনস্তাত্ত্বিক উপঢৌকন ছাড়া কিছুই নয়।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য ফোরামের নেতৃত্বে সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ বাতিলের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ চলছে। সরকার এই আন্দোলন প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ায় অনেকের মতে, এই প্রণোদনার ঘোষণা আন্দোলন ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার প্রয়াস।
ঐক্য ফোরামের কো-চেয়ারম্যান বাদীউল কবীরের ভাষায়, “কর্মচারীদের শান্তিপূর্ণ আচরণকে যদি দুর্বলতা ভাবেন, তাহলে সেটি সরকারের জন্যই বুমেরাং হয়ে যাবে।”
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের ভাষায়, “২০১৫ সালের পর থেকে বেতন কাঠামো না বদলানোয় বিশেষ সুবিধা বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল।” বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ ৮৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে শুধু বিশেষ প্রণোদনায় ব্যয় হবে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
এই অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও সময় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ঈদের আগে এমন ঘোষণা সরকারের “লোক দেখানো বদান্যতা” কিনা—তা নিয়েও বিতর্ক প্রবল।
প্রায় ৫০ হাজার কর্মচারী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অবসরে যাবেন এবং পেনশনভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৮ লাখ ৫০ হাজারে। পেনশন খাতে সরকারকে বাড়তি ব্যয় মেটাতে হবে, ফলে বিশেষ প্রণোদনার আর্থিক চাপ আরও প্রকট হবে।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এটি কি টেকসই আর্থিক সিদ্ধান্ত, নাকি রাজনৈতিক কৌশল?
অনেক কর্মকর্তা বলছেন, “এই প্রণোদনা আমাদের আন্দোলনের লক্ষ্যকে দুর্বল করতে পারবে না। সরকার অধ্যাদেশ বাতিল না করলে আন্দোলন চলবেই।”
তাদের মতে, এ ঘোষণায় যতই আর্থিক সুবিধা থাকুক, এটি তাদের মৌলিক অধিকার হরণকারী অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারবে না।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি বড় আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তবে, এই সিদ্ধান্ত যদি মূল দাবি ও অসন্তোষের সমাধান না করে, বরং তাকে ঢাকার চেষ্টা করে, তাহলে তা কেবল ক্ষোভই বাড়াবে।
সরকারের উচিত হবে আন্দোলনরত কর্মচারীদের সঙ্গে সংলাপে বসে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো। কারণ, কেবল আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে বঞ্চনা ও বঞ্চনার অনুভূতি ঢেকে রাখা সম্ভব নয়।
