ঢাকা মেডিকেল কলেজে চলমান ছাত্রআন্দোলনের মুখে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা—দাবি আদায়ের আন্দোলন নাকি কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার ফল? বিশ্লেষণ করলেন আমাদের প্রতিবেদক।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভ জমেছে কলেজের জরাজীর্ণ আবাসন ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে। ঝুঁকিপূর্ণ ছাত্রাবাসে বসবাস, নতুন ভবনের বাজেট অনিশ্চয়তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাবে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা পাঁচ দফা দাবি উপস্থাপন করে আন্দোলনে নামেন।
প্রধান দাবি ছিল:
- বিকল্প আবাসনের জরুরি ব্যবস্থা
- নতুন ভবনের বাজেট দ্রুত পাস
- প্রকল্প বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ
- প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা
- ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বসবাসরত শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সরে যাওয়ার ব্যবস্থা
কলেজ প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, “শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা” নিশ্চিত করতেই এই অনির্দিষ্টকালীন বন্ধ ঘোষণা। তবে বাস্তবে এই সিদ্ধান্তকে অনেক শিক্ষার্থীই দেখছেন এক ধরনের ‘দমনমূলক কৌশল’ হিসেবে, যার মাধ্যমে আন্দোলনের গতিকে থামানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি বৈঠকের সিদ্ধান্তে:
- অনির্দিষ্টকালের জন্য এমবিবিএস পর্যায়ের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ
- ২২ জুন দুপুর ১২টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ত্যাগের নির্দেশ
- শুধুমাত্র পেশাগত পরীক্ষার্থী ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের এই নির্দেশনার বাইরে রাখা হয়েছে
শিক্ষার্থীরা বলছেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ বারবার আবেদন সত্ত্বেও আবাসন সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং আন্দোলনে গেলে সেটিকে “উসকানি” হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ফলে, ‘প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা’ ও ‘দায় এড়ানো’র অভিযোগ তুলেছেন তারা।
এক ছাত্রনেতা বলেন:
“আমরা তো নিরাপদ থাকার জন্যই বলেছি। আমাদেরই নিরাপত্তা ইস্যু করে এখন কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হলো? এটা স্পষ্টতই দমনমূলক।”
শিক্ষার্থীরা বর্ষবরণের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণাও দিয়েছে, যেটি কলেজ প্রশাসনের ‘চিন্তার কারণ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল আলম জানিয়েছেন, বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন একটি প্রধান অনুষ্ঠানের বর্জন স্পষ্টভাবে বর্তমান ক্ষোভ ও ব্যবস্থাপনা-ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত আরও বড় সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। যদি শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিকে আমল না দিয়ে শুধু ‘চাপ প্রয়োগ’ হয়, তবে তা ভবিষ্যতে বিস্তৃত ছাত্রআন্দোলনের জন্ম দিতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রস্তুতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান। সেখানে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির মুখে কলেজ বন্ধ করে দেওয়া কেবল একাডেমিক অগ্রগতি নয়, জনস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎকেও বিপন্ন করে তুলতে পারে।যেখানে সংলাপ হতে পারত উত্তরণের পথ, সেখানে দমনমূলক ব্যবস্থায় কতটুকু লাভবান হবে প্রশাসন, সেটি সময়ই বলবে।
