এনসিপি সংসদে ১০% আসনে ছাত্রদের জন্য কোটা প্রস্তাব করেছে। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বে তরুণদের অংশগ্রহণ নাকি নতুন এক ‘কোটাবাদ’? পড়ুন বিস্তারিত।
“ছাত্ররাই জাতির ভবিষ্যৎ”—এটি অনেক পুরোনো এবং বহু উচ্চারিত একটি কথা। তবে এবার সেই ভবিষ্যতের জন্য জাতীয় সংসদের ১০% আসন বরাদ্দের প্রস্তাব এনেছে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি’। তাদের ‘জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন’ বলছে, রাজনৈতিক দলগুলো যেন বাধ্য হয় ছাত্রদের মধ্যে থেকে এই আসনগুলোতে মনোনয়ন দিতে। রাজনৈতিক অংশগ্রহণে তরুণদের সক্রিয় করতে এমন প্রস্তাব আশাব্যঞ্জক মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এটি কি সত্যিই গণতন্ত্রের গভীরতর রূপায়ণ, নাকি নতুন ধরনের ‘মনোনয়নে কোটাপ্রথা’ চালুর অপচেষ্টা?
সাম্প্রতিক সময়ের ছাত্র আন্দোলনগুলোর শক্তিশালী ভূমিকা ও তরুণদের রাজনৈতিক জাগরণই এই প্রস্তাবের প্রেক্ষাপট। এনসিপি-ঘনিষ্ঠ নাগরিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই কমিশন বলছে, “ছাত্র সমাজ হলো নেতৃত্ব গঠনের আঁতুড়ঘর। সুতরাং জাতীয় সংসদের অন্তত ১০% আসনে ছাত্রদের মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত।”
এই প্রস্তাবকে তারা যুগান্তকারী হিসেবে চিহ্নিত করে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল ফারুক বলেন, “সত্তরের দশকের ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মাইলফলক। বর্তমান তরুণরাও সেই ধারাবাহিকতায় নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।
তবে বুদ্ধিজীবী মহল ও বিশ্লেষকদের বড় অংশ এই প্রস্তাবকে ভালোভাবে নেয়নি। বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. হাসান মাহমুদ মন্তব্য করেছেন, “দলীয় মনোনয়ন হচ্ছে রাজনৈতিক পরিপক্বতা, দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয়। সেখানে ছাত্র পরিচয়ের ভিত্তিতে বাধ্যতামূলক কোটা রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।”
মার্কিন বিশ্লেষক আলী রিয়াজের মতে, “ছাত্রদের অংশগ্রহণ অবশ্যই দরকার, কিন্তু তা যেন হয় রাজনৈতিক স্বাভাবিক গতিধারার মধ্য দিয়ে, বাইরের চাপ বা প্রাতিষ্ঠানিক কোটার মাধ্যমে নয়।”
এখানে আরেকটি বিতর্ক উঠে এসেছে—‘ছাত্র’ শব্দটির সংজ্ঞা। আজকের বাংলাদেশে অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যয়নরত থাকেন বা রাজনৈতিক সুবিধার্থে ছাত্র পরিচয় বহাল রাখেন। তাহলে সংসদে এই ‘ছাত্র’ মনোনীত হলে তারা আদতে কতটা তরুণ? কার স্বার্থে তারা কাজ করবেন? প্রশ্ন উঠছে, এই তথাকথিত ছাত্রদের পেছনে কোনো গোষ্ঠীস্বার্থ বা ব্যবসায়িক পৃষ্ঠপোষকতা কাজ করছে কি না।
জাতীয় পর্যায়ের প্রধান দলগুলোর প্রতিক্রিয়া বেশ সতর্ক। দলীয় নীতিনির্ধারকরা বলছেন, “বাইরের কোনো সুপারিশ বা কোটা আমাদের মনোনয়ন প্রক্রিয়ার ওপর চাপিয়ে দেওয়া চলবে না। তরুণদের অংশগ্রহণ দরকার, কিন্তু সেটা হবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়।”
এখানে বোঝা যাচ্ছে, দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, নেতৃত্বের বিকাশ ও রাজনৈতিক পরিপক্বতা এখনো দলের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণদের অংশগ্রহণ অবশ্যই সময়োপযোগী একটি বিষয়। তবে তা হতে হবে নীতিনির্ধারণী পরিসরে স্বাভাবিক অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে। জোর করে কোনো গোষ্ঠী বা শ্রেণিকে আলাদা করে সংসদে তুলে আনার অপচেষ্টা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য প্রতিকূল হতে পারে।
বিশ্লেষক ড. আনোয়ার হোসেনের ভাষায়, “যৌবনের নেতৃত্ব রাজনীতিকে প্রাণবন্ত করতে পারে, কিন্তু তাকে কোটার ফ্রেমে আটকে দিলে তা হয়ে উঠবে একধরনের ‘আধুনিক রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা’।”
এনসিপি’র প্রস্তাব তরুণদের সক্রিয় রাজনীতি অভিমুখে একটি আলোচনার সূত্রপাত করেছে নিঃসন্দেহে। তবে তা যেন শুধুমাত্র প্রচারসর্বস্ব বা নির্বাচনী জনপ্রিয়তা অর্জনের হাতিয়ার হয়ে না দাঁড়ায়। তরুণদের সম্পৃক্ত করতে হলে লাগবে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, দলীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তি এবং নেতৃত্বের বিকাশের পরিবেশ—না যে শুধু একটা ‘কোটা’।
জাতীয় সংসদে ‘ছাত্রদের’ জন্য আলাদা কোটা না হোক, তরুণদের জন্য আলাদা জায়গা হোক—তা হওয়া উচিত সবার চেষ্টায়, সময় নিয়ে, এবং গণতন্ত্রের মূল সুরটি বজায় রেখেই।
