ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের কাঠালকান্দিতে ছাত্রদল নেতা খুনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-যুবদলের সংঘর্ষে গ্রাম পরিণত হয়েছে ভূতুড়ে জনপদে। লুটপাট, অগ্নিসংযোগে উদ্বাস্তু শতাধিক পরিবার। প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ভয়াবহ রূপ উঠে এসেছে এই বিশ্লেষণে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের একটি নিভৃত গ্রাম—কাঠালকান্দি। সম্প্রতি এই গ্রামটি যেন রাজনৈতিক বিভেদের এক জ্বলন্ত উপাখ্যানে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় রাজনীতির শাখা সংগঠনগুলোর গোষ্ঠীগত প্রতিযোগিতা এবং দখলদারিত্বের জেরে ৫ জুলাই নিহত হন ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. সোহরাব মিয়া। এই মৃত্যুর পরেই শুরু হয় দাহ ও ধ্বংসের উন্মত্ত উত্সব।
নিহত সোহরাব মিয়া ছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোতাহার হোসেনের অনুসারী ‘মোল্লা গোষ্ঠী’-র অন্যতম মুখ।
বিপরীতে যুবদলের সভাপতি গিয়াস উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ‘উল্টা গোষ্ঠী’-র সাথে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল সংঘাত।
৫ জুলাইয়ের সংঘর্ষে সোহরাবের মৃত্যুর পর পাল্টা প্রতিশোধের অগ্নিসংযোগ শুরু হয়—যার প্রথম শিকার হয় উল্টা গোষ্ঠীর বাড়িঘর ও সম্পদ।
গত তিন দিনে কাঠালকান্দি যেন রণক্ষেত্র। লুট হয়ে গেছে ১২টি গরু, প্রায় ১ হাজার মণ ধান, চাতলপাড় বাজারের ছয়টি দোকান।
দোকানগুলোতে ছিল চালের আড়ত, মোবাইল-বিকাশ সার্ভিস, রড-সিমেন্ট, ফ্রিজ শোরুম। অভিযোগ উঠেছে প্রায় ২০ কোটি টাকার মালামাল লুটের।
নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন গ্রামের সাধারণ মানুষ। অন্তঃসত্ত্বা নারী কোহিনুর বেগম বলেন, “আমার গলা থেকে স্বর্ণ ছিনিয়ে নিয়েছে। ওষুধ পর্যন্ত নিয়ে গেছে।”
শতাধিক পরিবার গ্রাম ছেড়েছে—কারও গন্তব্য আত্মীয়ের বাড়ি, কারও ঠাঁই খোলা আকাশের নিচে। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, একদম চোখের সামনে।
এসবই ঘটেছে মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রতিশোধপরায়ণতায়।
চাতলপাড় বাজারেও হামলার প্রভাব ভয়াবহ। বাজারের ব্যবসায়ী হামজা জানান, “২৫ লাখ টাকা নগদ এবং দোকানের সব পণ্য লুট করে নিয়েছে।
আমার বেঁচে থাকার অবলম্বনই শেষ হয়ে গেল।” ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সোহরাব খান বলেন, “এখানে এখন কোনো নিরাপত্তা নেই।”
মোল্লা গোষ্ঠীর মোতাহার হোসেন ঘটনার জন্য উল্টা গোষ্ঠীকেই দায়ী করেছেন, এবং অভিযোগ করেছেন—”নিজেরা নিজের দোকান ভেঙেছে নাটক সাজাতে”। প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে’, কিন্তু বাস্তবতার চিত্র ভিন্ন।
চাতলপাড় পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম বলেন, “জনবল কম থাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনী পরিদর্শনে এসেছে।”
এই ঘটনার প্রতিটি মুহূর্ত দেখায়—রাজনীতির শাখা সংগঠনগুলো কিভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে তছনছ করে দিতে পারে।
ছাত্রদল, যুবদল, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপি নেতৃত্বের গোষ্ঠীভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের ফলে পুরো কাঠালকান্দি পরিণত হয়েছে ভুতুড়ে গ্রামে।

রাজনৈতিক আদর্শ নয়, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থ যেখানে মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে—সেখানে সাধারণ জনগণ শুধু রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের পণ্য হয়ে পড়ে। প্রশাসনের দায় এড়ানোর সংস্কৃতি ও দৃষ্টিকটূ নির্লিপ্ততা এই সঙ্কটকে আরও গভীর করেছে।
কাঠালকান্দি কেবল একটি গ্রাম নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক গোষ্ঠীচালিত সহিংস বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ছাত্রদল নেতার মৃত্যু সেখানে শুধুই একটি সূচনা—যার পরিণতি গৃহহীন মানুষ, লুট হওয়া ব্যবসা, পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন।
এই সহিংসতার দায় শুধু দুই গোষ্ঠী নয়, দায় প্রশাসনের, রাজনৈতিক নেতৃত্বের এবং জাতীয় রাজনৈতিক কৌশলের ব্যর্থতারও।
