যুদ্ধবিধ্বস্ত ১৮টি দেশের কাতারে বাংলাদেশ! জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের মিশন বাংলাদেশে কেন? শান্তিপূর্ণ দেশ হয়েও কি আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় চলে যাচ্ছে বাংলাদেশ? বিশ্লেষণ করছে এই প্রতিবেদন।
২০২৫ সালের জুলাই মাস। ঠিক এক বছর আগেও আমরা ছিলাম মধ্যম আয়ের দেশের স্বপ্নে বিভোর—এসডিজি, ভিশন ২০৪১ আর স্মার্ট বাংলাদেশের স্লোগানে উচ্চকিত। কিন্তু আগস্ট ২০২4 থেকে শুরু হওয়া ছাত্রআন্দোলন, দমনপীড়ন, সাংবাদিক নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং রাজনীতিকদের দমননীতির মাঝে দাঁড়িয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি মানবিক বিপর্যয়ের মুখে?
জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের যে ১৮টি দেশে মিশন আছে—বুরকিনা ফাসো, চাদ, কম্বোডিয়া, সুদান, সিরিয়া, ইয়েমেন, ফিলিস্তিন, ইউক্রেন—তাদের প্রায় প্রত্যেকটি যুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিপতিত।
এই তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ—বিশ্বের চোখে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতি এক গভীর সংকটে।
এখানে দুটো দৃষ্টিকোণ উঠে আসে:
ড. ইউনূস ইস্যুতে নোবেল বিজয়ীদের খোলা চিঠি, ইউরোপীয় সংসদের প্রস্তাব, ওয়াশিংটন থেকে সতর্কবার্তা—সব মিলিয়ে সরকার এককভাবে ‘গো-ইট-অ্যালোন’ নীতি থেকে কিছুটা সরে এসেছে।
সুশাসনের প্রতীক হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে উপস্থাপন করতে গেলে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনকে বরং সহায়ক কাঠামো হিসেবে দেখাতে পারে বর্তমান প্রশাসন।
সত্যি কথা বলতে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কি আদৌ এই মিশন সম্পর্কে জানে? বুঝে?
এখনও যারা “জাতিসংঘ এসেছে শান্তি আনতে” মনে করেন, তাদের জন্য একটি তথ্য—এই মিশন পর্যবেক্ষণ করে, রিপোর্ট দেয়, সুপারিশ করে। কিন্তু প্রয়োগ করে না।
তবে প্রশ্ন হলো, দেশ কি এমন পর্যায়ে গেছে, যেখানে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ দরকার হয়ে পড়েছে?
বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জাতিসংঘকে সরাসরি যুক্ত করতে সম্মত হওয়াটা একটি মৌলিক পরিবর্তন।
ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা ইস্যু বা আদিবাসী অঞ্চলে জাতিসংঘের সরাসরি হস্তক্ষেপের পথ খুলে যেতে পারে।
বিএনপি, গণতন্ত্র মঞ্চ কিংবা নবগঠিত ট্রানজিশনাল কাউন্সিল—যে দলই হোক, সবাইকে এবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের আলোকে বিচার করা হবে।
র্যাব, পুলিশ, ডিবি—সব বাহিনীর কার্যক্রম এখন জাতিসংঘ পর্যবেক্ষণ মিশনের নজরে আসবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পরে এবার সরাসরি আন্তর্জাতিক রিপোর্ট তৈরি হবে—যা সরকার, সেনাবাহিনী ও বিচারব্যবস্থার জন্য চাপ বাড়াবে।
প্রশ্ন আসতেই পারে—ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি স্বচ্ছ অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তো মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কথা। তাহলে এই মিশন কেন?
এখানে দু’টি সম্ভাবনা কাজ করতে পারে—
হয়তো জাতিসংঘ আগেই মিশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা এখন কেবল বাস্তবায়িত হচ্ছে।
অথবা, আন্তর্জাতিক মহল এখনও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে সন্দিহান—চায় চলমান পরিবর্তন কেবল “পলিশ” না হয়ে সত্যিকারের “ট্রান্সফর্মেশন” হোক।
যদি সত্যিই আমরা বিশ্বাস করি—“এই দেশ আমার, এই দেশের মালিক আমি”—তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ শুধু জাতিসংঘের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না।
বরং গণতান্ত্রিক কাঠামো, মানবিক প্রশাসন ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মিশনের প্রয়োজনীয়তা যেন আর না পড়ে, সেই পথ আমাদেরই তৈরি করতে হবে।
