ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হকের জামায়াত সংশ্লিষ্টতা, সেনাবাহিনী পুনর্গঠনে ভূমিকা ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ। অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরের দ্বন্দ্বে তার অবস্থান কী ছিল?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে একটি নীরব কিন্তু দৃশ্যত সফল সামরিক-পলিটিক্যাল মিশনের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রকাশ পায়। কেন্দ্রে ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক—সাবেক ডিজিএফআই প্রধান, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিন্যাসে ছিলেন সক্রিয়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সক্রিয়তা কি রাষ্ট্রকে রক্ষার প্রয়াস, না কি জামায়াত সংশ্লিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রবেশ পরিকল্পনার অংশ?
২০২২ সালের নভেম্বরে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন হামিদুল হক।
এই সময়কালটি ছিল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বিক্ষোভে টালমাটাল।
অথচ তিনি সেই সময় সেনাবাহিনীর ভেতরে ‘নিরপেক্ষতা বজায়’ রাখার নামে রাজনীতির সঙ্গে এক প্রকার ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যাক্টিভিজম’ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষত, জামায়াতে ইসলামীর একটি অংশের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের দাবি উঠে এসেছে একাধিক সূত্র থেকে।
কেউ কেউ বলছেন, এই সংযোগের পেছনে ছিল ৫ আগস্টের আগে আন্দোলনের পালে হাওয়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আদান-প্রদান।
সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান যখন জনগণের ওপর গুলি চালানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন,
তখন হামিদুল হক তাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিলেও, ভেতরে ভেতরে সেনা বিভ্রান্তির একটি কৌশলও সম্ভবত বাস্তবায়ন করছিলেন।
বিশেষ করে এসএসএফের বরখাস্ত হওয়া মুজিবুর রহমান ও এনটিএমসির জিয়াউল আহসানের ‘অভ্যন্তরীণ ক্যু’ পরিকল্পনা নামে মিথ্যাচারের নাটক এবং সেনাপ্রধান কে নিজের পকেটে আবদ্ধ রাখাই ছিল হামিদুল হকের প্রধান মিশন।
একদিকে সেনাপ্রধানের কাছেও ভাল থাকলো অন্যদিকে তার চলার পথের প্রধান কাঁটা গুলো সরানো হলো।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে যখন তার নামে থাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো অবরুদ্ধ হয়, তখন তা নিছক ‘করণিক ত্রুটি’ বলে ব্যাখ্যা দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন।
অথচ প্রশ্ন থেকেই যায়—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ কেন এক ব্যক্তির নামে পরিচালিত হবে?
২০১০ সালের বিডিআর বিদ্রোহের সময়ও হামিদুল হক আলোচনায় ছিলেন, যদিও তখনো তার মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি সেনা হাই-কম্যান্ডে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছিল।
এক পর্যায়ে তাকে সতর্ক করে বরখাস্ত না করলেও তার ক্যারিয়ারে দাগ পড়ে যায়।
যদিও হামিদুল হক দাবি করেছেন তিনি সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে দূরে রাখতে চেয়েছেন, বাস্তবতা হলো তিনি নিজেই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন।
ডিজিএফআই প্রধান থাকা অবস্থায় তার রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং বিশেষত জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আজ প্রশ্ন তোলে—তিনি কি কেবল একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা ছিলেন, নাকি আদতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রে একটি প্রবেশ পথ খুলে দিয়েছেন?
মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হকের সেনা জীবন ও পরবর্তী রাজনৈতিক সংযোগ এখন নতুন আলোচনার বিষয়।
অন্তর্বর্তী সরকার যাকে শুরুতে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সহায়ক হিসেবে চেয়েছিল, তার বিরুদ্ধেই এখন তদন্ত চলছে।
যার পেছনে রাজনৈতিক সংযোগ, অর্থনৈতিক বিতর্ক ও গোয়েন্দা সংস্থার অপারেশনাল দুর্বলতা রয়েছে যা মেটিক্যুলাস ডিজাইনের অন্তর্ভুক্ত।
বেপার টা হচ্ছে, তিনি সবকিছু ঘটিয়ে পেছনে স্বচ্ছ থাকার একটি অপপ্রয়াস। কারন তিনি তার মিশন সফল করে স্বেচ্ছায় মাঠ ত্যাগ করেছেন।
অন্তত একটি সত্য আজ স্পষ্ট—বাংলাদেশের নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতর এখনো অতীতের ছায়া গাঢ়ভাবে রয়ে গেছে এবং সেই ছায়া কতটা দীর্ঘ, তা নির্ভর করছে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার ওপর।
