চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হেফাজতে ইসলামের আমির মহিবুল্লাহ বাবুনগরী জামায়াতকে ‘ভণ্ড ইসলামী দল’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “মওদুদীর ইসলাম করলে ইমান থাকবে না।” এই বক্তব্যে ইসলামী রাজনীতির অভ্যন্তরে মতাদর্শিক বিভাজন স্পষ্ট হলো।
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি বরাবরই নানা মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ও দিকচ্যুতির সমীকরণে জর্জরিত। সর্বশেষ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী, যিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে আয়োজিত এক আলোচনাসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক ভাষায় বক্তব্য দিয়েছেন।
বাবুনগরী বলেন,
“জামায়াত ইসলামী ভণ্ড ইসলামী পার্টি, সহি ইসলামী পার্টি না।
জামায়াতে ইসলামীর ইসলাম হলো মওদুদীর ইসলাম আর আমাদের ইসলাম হলো মদিনার ইসলাম।
মওদুদীর ইসলাম করলে ইমান থাকবে না।”
এই বক্তব্য শুধু বর্তমান হেফাজতের অবস্থান নয়, বরং অতীত মুরব্বিদের মতামতের ধারাবাহিকতাও বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী,
জামায়াত ইসলাম নয়, বরং “মওদুদীয় মতাদর্শ” প্রতিষ্ঠা করতে চায়—যা প্রকারান্তরে ইসলামের প্রকৃত কাঠামো থেকে বিচ্যুতি।
এই বিতর্ক শুধুমাত্র ইসলামি চিন্তার ভিন্নতা নয়, বরং একটি গভীর রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন।
জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল ভারত উপমহাদেশে আবুল আ’লা মওদুদীর চিন্তাচেতনায়, যেখানে ইসলাম শুধু ধর্ম নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শব্যবস্থা।
অপরদিকে, হেফাজত ইসলামের মতাদর্শের মূল উৎস কওমি আলেমদের ‘দেওবন্দি’ ঘরানার বিশ্বাস ও প্রচলিত তরিকতভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।
হেফাজত ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে, বরং তারা ধর্মীয় মতাদর্শ ও জনমত গঠনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারে বিশ্বাসী।
কিন্তু জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হওয়ার চেষ্টা করে আসছে।
ফলে দুই পক্ষের মধ্যে এই মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব একসময় রাজনৈতিক জায়গাতেও প্রতিফলিত হয়।
বাবুনগরীর বক্তব্যে উল্লেখিত “মওদুদীর ইসলাম করলে ইমান থাকবে না” মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি শুধু মতভিন্নতা নয়—বরং একটি তাকফিরি (অপর মুসলিমকে অমুসলিম ঘোষণা) মনোভাবের প্রকাশ।
এ বক্তব্য ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ ধরনের আক্রমণাত্মক ধর্মীয় মন্তব্যের পর এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
তবে দলটির অনেক সমর্থক সামাজিক মাধ্যমে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন—
“মওদুদীর ইসলাম ইমানহীন”—এমন ফতোয়া দিয়ে হেফাজত ইসলাম নিজেদের ধর্মীয় দায়বদ্ধতা লঙ্ঘন করছে।
ধর্মীয় নেতারা যখন একে অপরকে ‘ভণ্ড’, ‘ইমানহীন’ বা ‘ভুল পথে’ আখ্যা দেন, তখন সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও ধর্মীয় বিভাজন তৈরি হয়।
বাংলাদেশের মতো একটি ধর্মপ্রবণ রাষ্ট্রে, যেখানে ইসলাম রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, সেখানে এমন বক্তব্য সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।
বাবুনগরীর বক্তব্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু এর প্রকাশভঙ্গি ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে এক নতুন মতবিভক্তির অধ্যায় শুরু হয়েছে।
একদিকে রয়েছে মওদুদীবাদ ও জামায়াতের প্রাতিষ্ঠানিক ইসলাম, অন্যদিকে হেফাজতের মাদ্রাসাভিত্তিক ইসলামি সমাজ রূপকল্প।
এই দ্বন্দ্ব শুধু আদর্শিক নয়—এটি রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নেও এক গুরুতর সংকেত বহন করে।
