বাংলাদেশে সেনানিবাসকেন্দ্রিক ভারতভীতি ও পাকিস্তানপন্থী মানসিকতা কীভাবে গ্লোবাল ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে উঠেছে এবং কীভাবে ২০২৪-এর দাঙ্গা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নতুন প্রাণ দিয়েছে, সেই বিশ্লেষণই এই নিবন্ধে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মনস্তত্ত্ব ও রাজনৈতিক বিকাশ বোঝার জন্য একটি গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কেন স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারছে না? এর উত্তর খুঁজলে দেখা যায়, দেশটির রাজনীতির মূলে একটি সুদূরপ্রসারী এবং আত্মবিধ্বংসী ভয় কাজ করছে—যা আত্মপ্রয়াসকে দমন করে এবং আত্মবিকাশকে প্রতিহত করে।
১৯৭১ সালে পরাজিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কেবল পরাজিত সৈন্যই রেখে যায়নি; তারা রেখে গিয়েছিল একটি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক মানসিকতা—ভারতবিদ্বেষ।
এই ভারতবিদ্বেষ আদতে ছিল ভারতের প্রতি ভয়, একপ্রকার inferiority complex, যা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মধ্যকার সেনানিবাসকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভারতভীতি পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে—যা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।
সেনানিবাসের ভারতবিরোধী মানসিকতা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, এবং একটি বিকৃত কল্পিত পাকিস্তান তৈরি করে—যা নিজের পরিচয়ে নয়, বরং একটি পরাশক্তির গোলাম হিসেবে রাষ্ট্রকে গড়ে তোলে।
এই প্যাসিভ পাকিস্তানি মানসিকতা প্রকৃতপক্ষে একধরনের post-colonial dominionism, যেখানে স্বাধীনতা মানেই অন্য কারো অধীন না হয়েও তার অনুমোদন ছাড়া চলতে না পারা।
এই পাকিস্তানি পরাধীনতা মানসিকতাকে বুঝে ফেলেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও গ্লোবাল ডিপ স্টেট।
তারা জানত,
বাংলাদেশে একটি আত্মবিশ্বাসী বাঙালি জাতীয়তাবাদ থাকলে সেটি দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন ভূরাজনীতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
অতএব, তারা পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রের ভারতভীতি ও পাকিস্তান-গোলাম মানসিকতাকে ব্যবহার করে:
- বেসামরিক সমাজকে সামরিক সংস্কৃতিতে ঢুকিয়ে ফেলে
- আত্মনির্ভর বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়
- মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই এক কল্পিত “নিরপেক্ষতা” তৈরি করে
স্বাধীনতার পর বাঙালি জাতীয়তাবাদ এক পর্যায়ে নগরভিত্তিক ভোগবাদ, কর্পোরেট নির্ভরতা ও মিডিয়া-পরিচালিত মতাদর্শে ঢেকে পড়ে।
জাতীয়তাবাদ তখন ব্র্যান্ডিং হয়, রাজনীতি নয়।
এই প্রজন্মের অনেকেই ভুলে যায় ১৯৭১-এর আকাঙ্ক্ষা বা বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগের তাৎপর্য।
কিন্তু ইতিহাস কখনো চুপচাপ থাকে না।
২০২৪ সালের দাঙ্গা—যা শহুরে স্বস্তি, মিডিয়া-নিয়ন্ত্রিত নিরপেক্ষতা ও বিদেশি প্রভাবের বিপরীতে ঘটে—এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঘুম ভাঙানোর চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়ায়।
এই দাঙ্গা কেবল অস্থিরতা নয়, এটি এক জাতীয় পুনর্জাগরণের সূচনা।
এই দাঙ্গায় অংশ নেয়া তরুণ, শহুরে মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ শ্রমজীবীরা সবাই বুঝে যায়—রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র, সেনানিবাস-নির্ভর pseudo-Pakistan এবং বিদেশি দূতাবাস দ্বারা পরিচালিত বাংলাদেশ তাদের নয়।
তারা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের দাবিদার।
গত এক বছরেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
- সামাজিক মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু, ৭১, জাতির পিতা নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে
- স্কুল-কলেজে ছাত্রদের মধ্যে ‘মুজিববাদ’ চর্চার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিচ্ছে
- কর্পোরেট বা মিডিয়া-নির্ভর জাতিসত্তার বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ভাষাকে কেন্দ্র করে আত্মপরিচয় পুনঃসংজ্ঞায়িত করছে
ভয় একটি আত্মবিধ্বংসী শক্তি, যেমনটি বহু মনোবিজ্ঞানী বলে গেছেন।
বাংলাদেশের অস্তিত্বে লুকিয়ে থাকা সেনানিবাসের ভারতভীতিই তার রাজনীতির কেন্দ্রে ভয়কে প্রতিষ্ঠা করেছে।
কিন্তু ইতিহাসের একটি মোড় এসেছে—যেখানে ভয় আর জাতীয়তাবাদের সামনে বাধা হতে পারছে না।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ আবারও ফিরে আসছে—আর তার প্রতিদান হয়তো আরও বড় হবে, আরও গর্বিত হবে।
