একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের “জাকার্তা মেথড” গণহত্যার নকশা আজও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। দ্বিতীয় ক্যাবালের নতুন ষড়যন্ত্র কীভাবে বাংলাদেশকে আবারো গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে তার বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমরা দেখি স্বাধীনতার সংগ্রাম হিসেবে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৭১ সালের ঘটনাটি ছিল এক ধরনের “সিআইএ মডেলের জাকার্তা মেথড”। এই মেথড অনুযায়ী একটি জাতিকে গৃহযুদ্ধে ঠেলে দিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ধ্বংস করার নকশা আঁকা হয়েছিল। পাকিস্তানি জেনারেলদের মানসিক বিকারগ্রস্ততা থেকেই এ পরিকল্পনার সূত্রপাত, যেখানে তিন মিলিয়ন মানুষ হত্যার সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত।
১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন:
“ওদের মধ্যে তিন মিলিয়নকে মেরে ফেলো, আর বাকিরা আমাদের হাত চেটে খাবে।”
সেই নির্দেশই পরিণত হয় ২৫ মার্চের ভয়াল “অপারেশন সার্চলাইট”-এ, যা গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও গণনির্যাতনের মাধ্যমে চলতে থাকে মাসের পর মাস।
কিন্তু এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভেতরে সবাই একমত ছিলেন না।
গভর্নর ভাইস-অ্যাডমিরাল আহসান, জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান এবং এয়ার কমোডর জাফর মাসুদ সামরিক সমাধানের বিরোধিতা করেছিলেন।
তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন রাজনৈতিক সংকটের সমাধান সামরিক অভিযানে সম্ভব নয়।
কিন্তু তাঁদের সরিয়ে এনে টিক্কা খানের হাতে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয়—যিনি হয়ে ওঠেন ‘ঢাকায় গণহত্যার কসাই’।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ডিপ স্টেট চেয়েছিল—আওয়ামী লীগ ও হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে একটি ভৌগোলিক অঞ্চলকে পুনরায় ইসলামি পাকিস্তান বানাতে।
এজন্য তারা রাজাকার, আলবদর, আল শামসের মতো বাহিনী দাঁড় করায় এবং সিআইএ প্রণীত ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা মডেল প্রয়োগ করে।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, সেই চক্রান্ত শুধু ১৯৭১ সালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্বাধীন বাংলাদেশের পরও তার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ছিল আওয়ামী নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা।
২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ড ছিল সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টির পরিকল্পনা।
২০২৪ সালের মার্কিন রঙিন দাঙ্গা ছিল আওয়ামী ও হিন্দু ক্লিনজিং-এর নতুন সংস্করণ, যাতে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়।
আজকের বাংলাদেশেও একধরনের “দ্বিতীয় ক্যাবাল” সক্রিয়।
তারা সরাসরি পাকিস্তানি বা জামাতপন্থী নয়; বরং বাম-ডান মিলিত এক সামরিক-বেসামরিক জোট, যারা সুযোগের অপেক্ষায়।
এদের পরিকল্পনা হলো—
আওয়ামী লীগ ও জামাত-ডানপন্থীদের সংঘর্ষে শক্তির ক্ষয় ঘটানো।
তার সুযোগ নিয়ে “ইসলামী বিপ্লব” চাপিয়ে দেওয়া, যা তুরস্ক বা ইরানের ধাঁচের।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে একটি বিকৃত শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।
এই শক্তিগুলো ভুলে যায়, বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রকেন্দ্রিক।
এখানে বিদেশি ছক বা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো বিপ্লব টিকবে না।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—বাংলাদেশিরা নিজেদের রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে; তাই কোনো জাকার্তা মেথড, কোনো ক্যাবাল, কোনো কৃত্রিম বিপ্লব সফল হবে না।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি ক্যাবালের নকশা ভেস্তে গেছে; আজকের বাংলাদেশেও দ্বিতীয় ক্যাবালের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে।
তবে আশঙ্কা থেকেই যায়—প্রতিবারই এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।
তাই জাতিকে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশ কোনো গোপন চক্রান্তের হাতে সমর্পণ করা যাবে না।
