জেএমবিএফ-এর প্রতিবেদন বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে ৮৪৯ আইনজীবী দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন, ২০৩ জন কারাবন্দি।
প্যারিসভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) এক যুগান্তকারী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশের আইনজীবীদের ওপর সংঘটিত পদ্ধতিগত দমন-পীড়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়কালটি ছিল আইন পেশার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দমনযুগ।
প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রণয়ন প্রক্রিয়া;
এই প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করেছেন জেএমবিএফ-এর কার্যনির্বাহী সদস্য জান্নাতুল ফেরদৌস, সম্পাদনায় ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহানুর ইসলাম।
এটি কাউন্সিল অব বার্স অ্যান্ড ল’ সোসাইটিজ অব ইউরোপ (সিসিবিই)-এর কারিগরি সহযোগিতায় প্রস্তুত হয়।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিবেদনটি ফ্রান্সের প্যারিস ও বেলজিয়ামের ব্রাসেলস থেকে একযোগে প্রকাশিত হয়।
দমন-পীড়নের পরিসংখ্যান;
জেএমবিএফ জানায়,
- ২৬৮টি নথিভুক্ত ঘটনায় ৮৪৯ জন আইনজীবী দমন-পীড়নের শিকার হন।
- ২০৩ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়, যাদের অনেকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার।
- ৪ জন আইনজীবী নিহত, ২৬টি শারীরিক হামলা, ৭টি চেম্বার ভাঙচুর।
- আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা ৮৮% ভুক্তভোগী, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়নের ইঙ্গিত দেয়।
জেএমবিএফ-এর বক্তব্য;
জেএমবিএফ সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহানুর ইসলাম বলেন,
“ইউনূস সরকারের অধীনে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের ওপর একটি সংগঠিত আঘাত।”
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার মিথ্যা মামলা, নির্বিচার গ্রেপ্তার ও পেশাগত বঞ্চনার মাধ্যমে বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় এনেছে।
ফরাসি মানবাধিকার কর্মী রবার্ট সিমন বলেন,
“আইন পেশার স্বাধীনতা এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”
সিসিবিই মানবাধিকার কমিটির সভাপতি বারবারা পোর্তা বলেন,
“স্বাধীন আইন পেশা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। আইনজীবীদের কণ্ঠরোধ মানে সমাজের কণ্ঠরোধ।”
বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক প্রভাব;
প্রতিবেদন অনুসারে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে ৪৬ জন বিচারপতি ও বিচারককে গ্রেপ্তার, বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া ১৬টি জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন বিএনপি–জামায়াতপন্থীরা দখল করেছে, এবং ৪৪টি জেলায় আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।
দমন-পীড়নের মূল কারণ;
জেএমবিএফ মনে করে, এই সংকটের পেছনে রয়েছে—
- রাজনৈতিক দখল,
- দমনমূলক আইনের অপব্যবহার,
- অপরাধীদের দায়মুক্তি,
- গণমাধ্যমের সেন্সরশিপ,
- এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার অভাব।
আন্তর্জাতিক আহ্বান;
জেএমবিএফ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—
- বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ,
- দায়ীদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা,
- ও ঝুঁকিতে থাকা আইনজীবীদের আন্তর্জাতিক সহায়তা সম্প্রসারণের।
সুপারিশ ও ভবিষ্যৎ করণীয়;
প্রতিবেদনটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে—
- স্বাধীন বিচার তদারকি সংস্থা গঠন,
- মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি,
- আইনজীবীদের নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সুরক্ষা জোরদার করা,
- এবং মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারসহ আটক আইনজীবীদের মুক্তি।
বার্তা কি?
জেএমবিএফ-এর এই প্রতিবেদন শুধু একটি মানবাধিকার নথি নয়—
এটি বাংলাদেশের আইন পেশার স্বাধীনতার ওপর এক যুগান্তকারী সতর্কবার্তা।
বিশ্ব এখন দেখছে, একটি রাষ্ট্র যখন বিচারপেশাকে নিয়ন্ত্রণে নেয়, তখন ন্যায়বিচারের ভিত্তিই নড়ে যায়।
রেফারেন্স:
- JusticeMakers Bangladesh in France (JMBF), “Persecution of Lawyers under Interim Government: Bangladesh 2025”
- Council of Bars and Law Societies of Europe (CCBE) – Human Rights Division
- France24 Human Rights Desk Reports, October 2025
