সশস্ত্র বাহিনী ‘মানুষের পক্ষে’ ছিল বলে পূর্বের শাসন দ্রুত শেষ হয়েছে—ইউনূসের বক্তব্যে ৫ আগস্ট সেনা হস্তক্ষেপ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রশ্ন আবারও আলোচনায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক বিবৃতিতে বলেন, “সশস্ত্র বাহিনী মানুষের পক্ষে থাকায় বিগত শাসনের অবসান দ্রুত হয়েছে।”
মিরপুর সেনানিবাসের ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ (DSCSC) ২০২৫ এর গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠানে দেওয়া এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
বিশ্লেষকরা বলছেন—
ইউনূসের এই মন্তব্যে প্রকৃত অর্থে তিনি ৫ আগস্টের রাতের সেনা হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে চেয়েছেন এবং একই সঙ্গে স্বীকারও করে ফেলেছেন যে সামরিক বাহিনীর অবস্থানই “শাসন পরিবর্তন”-এর প্রধান কারণ ছিল।
অনেকে এটিকে “অসময়ে বলা অনিচ্ছাকৃত সত্য” বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।
“শিক্ষার্থীরা স্বাধীন, কিন্তু সেনারা পারে না”—ইউনূসের বক্তব্যে দ্বৈত মান?
ইউনূস বলেন—
“একজন শিক্ষার্থী যেকোনো কিছু করতে স্বাধীন, কিন্তু সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য তা পারে না। তারা শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী।”
কিন্তু পরক্ষণেই তিনি জানান—
সেনা সদস্যরা “মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোয়” পূর্বের শাসন দ্রুত পতন হয়েছে।
এই বক্তব্য থেকেই প্রশ্ন জাগে—
যদি সেনা সদস্যরা শৃঙ্খলাবদ্ধ হন, তবে কীভাবে তারা সরকার পরিবর্তনের রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়ালেন?
জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর নামে কি তারা সংবিধান ভঙ্গ করেছেন? এটি কি সামরিক নিরপেক্ষতার লঙ্ঘন নয়?
৫ আগস্টের ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক: ইউনূসের বক্তব্যে নতুন মাত্রা
অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সেনা নেতৃত্ব দাবি করে আসছিল— ৫ আগস্টের ঘটনাটি ছিল “মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজন।”
কিন্তু ইউনূসের বক্তব্যে উঠে এসেছে—
সেনাবাহিনী “মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে”—যা মূলত একটি সরকারি স্বীকারোক্তি যে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
অর্থাৎ এটি ছিল একটি রাজনৈতিক পক্ষ নেওয়া, যা সংবিধানের ১৪৭(৩) অনুযায়ী নিষিদ্ধ।
এ ব্যাখ্যায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—“ইউনূস নিজের মুখেই স্বীকার করলেন যে সেনাবাহিনী শপথ ভেঙেছে।”
শাসন পরিবর্তন কি সেনা প্রধানদের সিদ্ধান্তে হয়েছিল?
ইউনূস সরাসরি বলেন—
“আমাদের সশস্ত্র বাহিনী তাদের প্রধানদের নেতৃত্বে মানুষের পক্ষে প্রতিশ্রুত ছিল।”
এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়— সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত দায়িত্বে, সামরিক প্রধানদের নেতৃত্বেই “মানুষের পক্ষে” যুক্তি দেখিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে।
এটি যে একটি সামরিক ভূমিকা ছিল—তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
ইউনূসের বক্তব্যে আরও কয়েকটি বিতর্ক
১. “তরুণদের রক্তে শাসনামল পতন”—এটি কি সামরিক বিদ্রোহকে ন্যায্যতা দেওয়া?
২. “নতুন বাংলাদেশ”—রাজনৈতিক স্লোগান ব্যবহার করে তিনি কি নিরপেক্ষতা হারাচ্ছেন?
৩. “সেনাবাহিনী পেছনে দাঁড়িয়েছে”—রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহারের স্বীকারোক্তি?
এসব মন্তব্যে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
সার-কথা
এ ধরনের বক্তব্যের তিনটি গুরুতর প্রভাব:
সংবিধান লঙ্ঘনের পরোক্ষ স্বীকারোক্তি যে, সেনাবাহিনী রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে—এটি তিনি নিজেই বলেছেন।
সামরিক নেতৃত্বের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন; যদি সেনা প্রধানরা জনগণের বদলে সিদ্ধান্ত নেন—তাহলে গণতন্ত্র কোথায়?
ভবিষ্যতে সামরিক হস্তক্ষেপের ন্যায্যতা তৈরি- যেকোনো সরকারই তখন সেনাবাহিনীর “মানুষের পক্ষে থাকা”র দোহাই দিয়ে চাপের মুখে পড়বে।
