আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ডিফেন্স আইনজীবীকে হুমকির ঘটনায় ন্যায়বিচার, আইনজীবীর স্বাধীনতা ও বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা গভীর প্রশ্নে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ রোববার ঘটে যাওয়া ঘটনাটি শুধু একটি আদালত কক্ষের বিতণ্ডা নয়—এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজনীন নাহারকে প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলামের প্রকাশ্য হুমকি বিচারব্যবস্থার জন্য একটি অভূতপূর্ব ও উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।
ঘটনা অনুযায়ী, নাজনীন নাহার জানান—তার মক্কেলকে সেফহাউসে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আইন অনুযায়ী আইনজীবীর উপস্থিত থাকার অধিকার থাকা সত্ত্বেও তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি এবং কোনো নোটিশও প্রদান করা হয়নি। এই মন্তব্যের পরই প্রধান কৌঁসুলি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন:
“চুপ করে থাকেন। কথা বলবেন না। আপনাকেও আসামি করা যাবে।”
এই মন্তব্য আদালতে উপস্থিত সবার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
আইনজীবী মহলের ক্ষোভ: “এটা ন্যায়বিচারের জন্য হুমকি”
সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জে আর খান রবিন ঘটনাটিকে বিচারব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক নজির বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়—
“প্রধান কৌঁসুলি যদি ডিফেন্সের আইনজীবীকেই আসামি বানানোর হুমকি দেন, তাহলে আসামির ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কোথায় দাঁড়াবে?”
আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন—
“এটা শুধু নাজনীন নাহারের বিরুদ্ধে নয়, পুরো আইনজীবী সমাজের বিরুদ্ধে হুমকি।”
আইনজীবীরা মনে করেন, এ ধরনের আচরণ বিচারপ্রার্থী মানুষের আস্থা ধ্বংস করে এবং আদালতকে রাজনৈতিক প্রভাবাধীন মনে হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
আইসিটি নিয়ে ধারাবাহিক সমালোচনা: একপেশে আচরণের অভিযোগ
গত কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে—
- ডিফেন্স আইনজীবীদের হয়রানি
- মক্কেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ বাধাগ্রস্ত হওয়া
- জিজ্ঞাসাবাদে আইনজীবীকে উপস্থিত না রাখার প্রবণতা
- বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে—ডিফেন্স আইনজীবীর স্বাধীনতা ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত। কিন্তু প্রধান কৌঁসুলি নিজেই যখন আইনজীবীকে আসামি করার হুমকি দেন, তখন ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।
বিচারব্যবস্থার উপর আস্থা সংকট আরও গভীর হচ্ছে
আজকের ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতিহিংসামূলক আচরণ, এবং একপেশে বিচারপ্রক্রিয়ার অভিযোগকে আরও দৃঢ় করেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—এভাবে ভয় দেখিয়ে ডিফেন্স টিমকে নীরব করার চেষ্টা হলে বিচারব্যবস্থা তার নৈতিক ভিত্তি হারায়।
একজন সিনিয়র আইনজীবী বলেন—
“বিচার তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয় যখন উভয় পক্ষ সমানভাবে নিজেদের কথা বলার সুযোগ পায়। এখানে সেই সুযোগকে ভয় দেখিয়ে দমন করা হচ্ছে।”
