চুরির অপবাদে মব নির্যাতন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা ও কারাগারে মৃত্যু—রাজশাহীর ভ্যানচালক ওমর ফারুকের ঘটনায় তোলপাড় দেশ।
খ্রিস্টান ধর্মের সূচনালগ্নে নাসরতের যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার ঘটনাকে ইতিহাস দেখেছে শাসনব্যবস্থার ভয় ও দমননীতির প্রতীক হিসেবে। শাসকেরা চেয়েছিল—যেন আর কেউ অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুখ না তোলে। দুই হাজার বছর পর, বাংলাদেশে এক ভ্যানচালকের মৃত্যুকে ঘিরে সেই ইতিহাসের ছায়া নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—এ কোন বার্তা দিচ্ছে বর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজ?রাজশাহীর বাগমারায় চুরির অপবাদে আটক, কথিত মব নির্যাতন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা এবং শেষ পর্যন্ত কারাগারে মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ওমর ফারুক (৩৮)।
কীভাবে গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানো হলো
গত ১৭ ডিসেম্বর রাতে বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ এলাকায় ওমর ফারুককে চুরির অপবাদ দিয়ে আটক করেন স্থানীয় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরা। পরিবারের অভিযোগ, ওই সময় তাকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়। পরে পুলিশ ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
সিএনজিচালকরা এক পুরিয়া গাঁজাসহ ফারুককে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাদক সেবনের অভিযোগে তাকে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এরপর তাকে পাঠানো হয় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে।
কারাগারে অসুস্থতা ও মৃত্যু
কারাগারে থাকা অবস্থায় ওমর ফারুক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে শনিবার ভোরে তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যুসনদে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ফুসফুস ও হৃদযন্ত্র অকার্যকর এবং নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ বন্ধের উপসর্গকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের ভয়াবহ অভিযোগ
নিহতের পরিবার দাবি করছে, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নয়—বরং পরিকল্পিত নির্যাতনের ফল।
ফারুকের বাবা মোসলেম সরদার বলেন, পূর্বশত্রুতার জেরে তার ছেলেকে আটক করে হাত-পায়ে পেরেক ফুটানো হয়, মলদ্বারে মরিচের গুঁড়া ঢোকানো হয় এবং শীতের রাতে নদীতে চুবিয়ে নির্যাতন করা হয়।
মা পারুল বিবির ভাষায়, “আমার ছেলেটাকে পেরেক মেরে পানিতে চুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি খুনিদের বিচার চাই।”
প্রতিবেশী শামসুর রহমানও দাবি করেন, লাশ গোসল দেওয়ার সময় শরীরের বিভিন্ন স্থানে পেরেকের ক্ষত দেখা গেছে।
প্রশাসন ও ময়নাতদন্তের বক্তব্য
তবে পুলিশ ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য পরিবারের অভিযোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাগমারা থানার ওসি সাইদুল আলম জানান, উদ্ধারের সময় শরীরে হালকা আঘাত ছিল, তবে পেরেক ফুটানোর আলামত পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক শারমিন সোবহান কাবেরী বলেন, শরীরের কিছু অংশে চামড়া ছিলে যাওয়ার চিহ্ন মিলেছে,
কিন্তু পেরেক বা মরিচের গুঁড়া ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফরেনসিক রিপোর্ট হাতে পেলে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
শিশু সন্তানের কান্না ও সামাজিক প্রশ্ন
ওমর ফারুকের ১২ বছর বয়সী ছেলে তাসলিমুন হাসান তামিমের প্রশ্ন গোটা সমাজকে নাড়া দিয়েছে—“মা আগেই চলে গেছে, এখন বাবাও নেই। আমি কার কাছে থাকব?”
এই মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি মব জাস্টিস, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
যীশুর ইতিহাস থেকে বাংলাদেশের বাস্তবতা
যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল ভয় দেখানোর জন্য।
আজ যদি চুরির অপবাদে একজন ভ্যানচালক নির্যাতনের পর রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার ভেতর মারা যান, তবে সেটি কী বার্তা দেয়?
আইন, মানবতা ও ন্যায়বিচারের জায়গায় রাষ্ট্র কতটা দায়িত্বশীল—ওমর ফারুকের মৃত্যু সেই কঠিন প্রশ্নই সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
