বিনিয়োগ সম্মেলন, প্রতিশ্রুতি আর পরিসংখ্যানের আড়ালে আশিক চৌধুরীর বিনিয়োগ উদ্যোগ কি ফাঁপা বেলুন? বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
দেখতে স্মার্ট, উপস্থাপনায় সাবলীল, ইংরেজিতে দারুণ পারদর্শী—অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদেশ থেকে ‘হায়ার’ করে আনা আশিক চৌধুরীকে ঘিরে প্রত্যাশার কমতি ছিল না। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই তাঁকে ঘিরে তৈরি হয় এক ধরনের ‘আশিক ম্যাজিক’। বলা হচ্ছিল, বিনিয়োগ খরায় থাকা দেশকে তিনি বিদেশি পুঁজিতে ভাসিয়ে দেবেন।
কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তব চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। বিনিয়োগের বড় বড় ঘোষণা, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আর পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যার আড়ালে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি যে এখনো চাপে—তা সরকারি তথ্যই বলছে।
বিনিয়োগ সূচকে হতাশাজনক চিত্র
বিনিয়োগ পরিস্থিতি মূল্যায়নে সাধারণত তিনটি সূচক দেখা হয়—বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব,
বাংলাদেশ ব্যাংকের এফডিআই তথ্য এবং শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবণতা। তিন ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত গতি অনুপস্থিত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট এফডিআই বেড়ে ১৬৯ কোটি ডলারে পৌঁছালেও নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার—গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি করোনাকালেও নতুন বিনিয়োগ এর চেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ নিট এফডিআই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে পুরোনো কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ থেকে।
বিডায় নিবন্ধনে বড় ধস
অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডায় নিবন্ধিত মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ৬৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কম। করোনাকালের ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে নিবন্ধিত প্রস্তাব ছিল এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা, সেখানে বর্তমান চিত্র স্পষ্টতই নিম্নমুখী।
দেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এক বছরেই নিবন্ধিত দেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নেমেছে এক লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫২ হাজার কোটি টাকায়।
ব্যাংক, সুদ ও অনিশ্চয়তার চক্র
দেশি বিনিয়োগকারীদের মতে, রাজনৈতিক সরকারের অনুপস্থিতি, দুর্বল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ব্যাংক খাতের ইমেজ সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক ব্যাংকের ওপর ‘দেউলিয়া’ তকমা, ১৫ শতাংশের বেশি সুদহার এবং ঋণপ্রবাহের স্থবিরতা বিনিয়োগকারীদের পিছু হটতে বাধ্য করছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার ২৩.৫১ শতাংশ থেকে কমে ২২.৪৮ শতাংশে নেমেছে।
একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১৯ শতাংশ এবং ছয় মাস ধরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে।
সম্মেলন, গর্জন আর বাস্তবতা
আশিক চৌধুরীর উদ্যোগে চার দিনের বিনিয়োগ সম্মেলনে ৫০টি দেশের চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। সম্মেলন শেষে প্রায়
তিন হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাবের ঘোষণা আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনা প্রশংসাও কুড়ায়।
তবে বিনিয়োগ প্রস্তাব আর বাস্তব বিনিয়োগ এক বিষয় নয়—এ কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে,
দেশে এমন বহু উদ্যোক্তা আছেন যাঁরা একাই কয়েক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে সক্ষম, কিন্তু তাঁদের আস্থার জায়গা তৈরি হয়নি।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যেখানে পেয়েছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের এফডিআই, সেখানে ভারত পেয়েছে ২৭ বিলিয়ন,
ইন্দোনেশিয়া ২১ বিলিয়ন ও ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন ডলার। এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, জমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, ব্যাংকঋণ—যেকোনো একটি জায়গায় সমস্যা থাকলেই বিনিয়োগ চক্র থেমে যায়।
আর পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজের মতে, উদ্যোগ ও কর্মস্পৃহা থাকলেও বড় কাঠামোগত সংস্কার দৃশ্যমান হয়নি।
সমালোচকদের মতে, নীতিগত সংস্কারের বদলে বন্দর, লজিস্টিকস ও বড় অবকাঠামো চুক্তির মতো ‘হাই-ভ্যালু ডিল’-এ বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে বিনিয়োগ প্রচারণায় গর্জন থাকলেও বাস্তবে বর্ষণ হয়নি।
