নবনির্বাচিত সরকারে খলিলুর রহমানের বিদেশমন্ত্রী হওয়া ও সেনাপ্রধান জেনারেল জামানের সাথে তাঁর পুরনো বিরোধ বাংলাদেশের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জে ফেলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক | ঢাকা: বাংলাদেশের নবগঠিত মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন খলিলুর রহমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারে ‘টেকনোক্র্যাট’ কোটায় তাঁর বিদেশমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ ঢাকার রাজনৈতিক মহলে যেমন বিস্ময় তৈরি করেছে, তেমনই সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA) থাকাকালীন থেকেই খলিলুর রহমানকে নিয়ে বিতর্কের শেষ ছিল না। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে তাঁর ‘আদায়-কাঁচকলায়’ সম্পর্ক এখন কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর গুঞ্জন।
বিরোধের মূলে ‘মানবিক করিডোর’ ও সেনানিবাসে নিষেধাজ্ঞা
খলিলুর রহমান ও জেনারেল জামানের বিরোধের সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২৫ সালের মে মাসে। তৎকালীন এনএসএ খলিলুর রহমান রাখাইন সীমান্তে একটি বিতর্কিত ‘মানবিক করিডোর’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেনাপ্রধান সেই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশের মাটিতে কোনো ‘ব্লাডি করিডোর’ করতে দেওয়া হবে না।
পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়েছিল যে, জেনারেল জামান খলিলুর রহমানের ঢাকা সেনানিবাসে প্রবেশ পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছিলেন। নতুন মন্ত্রিসভায় বিদেশমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমানের অন্তর্ভুক্তির ফলে এই নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকার সম্ভাবনা প্রবল। একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সেনানিবাসে প্রবেশের পথ বন্ধ থাকা সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরকারের সংঘাতকে এক নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে।
সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ রদবদল ও সিজিএস পদ নিয়ে লড়াই
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, খলিলুর রহমান চাইছেন সেনাবাহিনীতে তাঁর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে সেনাপ্রধানকে কোণঠাসা করতে। বিশেষ করে সেনাবাহিনীতে বর্তমানে শূন্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ ‘চিফ অফ জেনারেল স্টাফ’ (সিজিএস) পদটি পূরণ নিয়ে পর্দার আড়ালে চলছে তুমুল লড়াই।
জেনারেল জামান ২০২৭ সালের জুন মাসে অবসরে যাবেন। অবসরের আগে তিনি চাইছেন তাঁর অনুগত অফিসারদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করতে। অন্যদিকে, খলিলুর রহমান ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু চাল সেনাপ্রধান ইতোপূর্বে সফল হতে দেননি। এই ‘ছায়াযুদ্ধ’ এখন মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ফাইল পর্যন্ত গড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন ‘ডিপ স্টেট’ ও ভূ-রাজনীতির প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, খলিলুর রহমানের এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের নেপথ্যে মার্কিন ‘ডিপ স্টেট’-এর জোরালো প্রভাব রয়েছে। আমেরিকা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে খলিলুর রহমানকে একজন বিশ্বস্ত ‘প্লেয়ার’ হিসেবে মনে করে।
অন্যদিকে, ভারত ও চীন বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
এই ত্রিমুখী ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ে খলিলুর রহমান ও সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত সংঘাত বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।
| বিষয় | পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের অবস্থান | সেনাপ্রধান জেনারেল জামানের অবস্থান |
| মানবিক করিডোর | রাখাইন সীমান্তে করিডোর তৈরির প্রস্তাবক। | সার্বভৌমত্বের স্বার্থে প্রস্তাবের তীব্র বিরোধী। |
| সেনা নিয়োগ | ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের সিজিএস পদে বসানোর চেষ্টা। | নিজস্ব চেইন অফ কমান্ড ও বলয় রক্ষার চেষ্টা। |
| আইনি অবস্থান | মার্কিন সমর্থিত টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী। | ২০২৭ সাল পর্যন্ত কমান্ডিং প্রধান। |
| সেনানিবাস প্রবেশ | বিদেশমন্ত্রী হিসেবে প্রবেশের অধিকার দাবি। | নিরাপত্তা অজুহাতে নিষেধাজ্ঞায় অনড়। |
উপসংহার
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে সেনাপ্রধান ও বিদেশমন্ত্রীর এই প্রকাশ্য কিংবা গোপন দ্বন্দ্ব কোনো শুভ লক্ষণ নয়।
খলিলুর রহমান যদি তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেন, তবে সেটি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ডেকে আনতে পারে।
জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারকে এই দুই শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
