শেখ হাসিনার মনোনীত দুই রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের আমলেই বিএনপির উত্থান ও আওয়ামী লীগের বিপর্যয়। গুরুত্বপূর্ণ পদে ভুল পদায়নের ঐতিহাসিক মাসুল নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।
বিশেষ রাজনৈতিক বিশ্লেষক | ঢাকা; বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের গতিপথ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ক্ষমতার মসনদ যতটা না রাজপথের লড়াইয়ে টলেছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কিছু আত্মঘাতী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দীর্ঘ যাত্রায় দুই জন ‘শাহাবুদ্দিন’-কে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়াকে কেন্দ্র করে বর্তমানে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দুই বিচারপতির আমলে কেবল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিপর্যয়ই ঘটেনি, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকেও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে নির্বাসিত করার পথ প্রশস্ত হয়েছে।
প্রথম শাহাবুদ্দিন: আওয়ামী লীগের দুর্দিনের কারিগর?
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ যে নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন, তাতে আওয়ামী লীগের চরম ভরাডুবি ঘটে। সেই পরাজয়ের ক্ষত কাটিয়ে ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা এক প্রকার ‘আবেগপ্রবণ’ হয়ে তাকে পুনরায় রাষ্ট্রপতি পদে আসীন করেন। কিন্তু ইতিহাসের পরিহাস হলো, সেই শাহাবুদ্দিন আহমেদের মেয়াদকালেই ২০০১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি বিশাল জয় নিয়ে ক্ষমতায় ফেরে।
আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, শেখ হাসিনা যাকে পরম মমতায় অভিভাবক বানিয়েছিলেন, তিনিই সংকটের মুহূর্তে দলের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করেছেন।
সেই সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে কোণঠাসা করে পুনরায় ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’-এর মতো ফারসি প্রভাবিত স্লোগানকে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে আধিপত্য দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো তার সময়ে শুরু হলেও, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সময় তিনি আওয়ামী লীগের রক্ষাকর্তা হতে পারেননি।
দ্বিতীয় শাহাবুদ্দিন ও সমসাময়িক রাজনৈতিক মহাপ্রলয়
সাম্প্রতিক সময়ে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে কেন্দ্র করে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা যেন সেই পুরোনো রাজনৈতিক ক্ষতেরই পুনরাবৃত্তি।
আওয়ামী লীগ যখন দ্বিতীয়বারের মতো তাকে এই সর্বোচ্চ আলঙ্কারিক পদে বসিয়েছিল, তখন অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন তার ব্যক্তিত্ব ও মেরুদণ্ড নিয়ে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তখন রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগ সমর্থকরাই হতাশ।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর তার পদত্যাগপত্র নিয়ে রাষ্ট্রপতির বিভ্রান্তিকর মন্তব্য কেবল তাকেই নয়, বরং তাকে মনোনীত করা দলকেও এক চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সমালোচকদের মতে, তিনি সংকটকালে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন, যার খেসারত আজ পুরো জাতি ও রাজপথের কর্মীদের দিতে হচ্ছে।
জয় বাংলার নির্বাসন ও ‘জিন্দাবাদ’ সংস্কৃতির পুনর্জন্ম
মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি এবং বাঙালির শৌর্য-বীর্যের প্রতীক ছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান।
কিন্তু এই দুই শাহাবুদ্দিনের আমলেই দেখা গেছে, এই জাতীয় স্লোগানকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এর পরিবর্তে পাকিস্তানি ধারার ‘জিন্দাবাদ’ সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় গণ্ডি থেকে মুছে ফেলার এই সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানদের পরোক্ষ সমর্থন বা নীরবতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতীয় জীবন থেকে মুছে ফেলার যে প্রক্রিয়া পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে শুরু হয়েছিল, তা এই মেরুদণ্ডহীন নেতৃত্বের কারণেই পুনরায় গতি পেয়েছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা।
গুরুত্বপূর্ণ পদে ‘অপদার্থ’ কর্মকর্তাদের পদায়ন: একটি জাতীয় সংকট
প্রতিবেদনের এই অংশটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অভিযোগ উঠেছে, শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে—তা সে সেনাপতি হোক কিংবা উচ্চপদস্থ আমলা—এমন ব্যক্তিদের বসিয়েছেন যারা সংকটের সময় আদর্শের বদলে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ব্যস্ত ছিলেন।
মেরুদণ্ডহীন নেতৃত্ব: যারা কেবল তোষামোদি করে পদ বাগিয়েছেন, তারাই কঠিন সময়ে দলের এবং রাষ্ট্রের পিঠে ছুরি মেরেছেন।
খেশারত দিচ্ছে জাতি: যোগ্যতার বদলে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ বিচারহীনতা ও দুর্নীতির কবলে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলের পর্যবেক্ষণ ও মিডিয়া রেফারেন্স
বাংলাদেশের এই নীতিনির্ধারণী সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
ভারতের বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’ (The Hindu) এবং ‘আনন্দবাজার’ বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও শেখ হাসিনার ‘ভুল লোক নির্বাচন’ করার প্রবণতা নিয়ে বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শেখ হাসিনা যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করেছিলেন, তারাই শেষ পর্যন্ত তার পতনের বা বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
বিবিসি বাংলা: তাদের এক বিশেষ ফিচারে উঠে এসেছে কীভাবে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে রাষ্ট্রপতির সাথে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল এবং কীভাবে তা বিরোধী পক্ষকে উৎসাহিত করেছিল।
তারেক রহমান ও বিএনপির ক্ষমতার পুনরুত্থান
বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তারা রাষ্ট্রপতির দপ্তরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছে।
১৯৯১ এবং ২০০১—উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ছিল আওয়ামী লীগের জন্য নেতিবাচক। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে এই বিচারবিভাগীয় ব্যক্তিত্বদের তথাকথিত ‘নিরপেক্ষতা’ বড় ভূমিকা পালন করেছে, যা আসলে আওয়ামী লীগের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আদর্শিক পরাজয় না কি রণকৌশলগত ভুল?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অপমানিত করে রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে নির্বাসিত করার যে ধারা, তা একদিনে তৈরি হয়নি।
যখনই কোনো আপসকামী ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের উচ্চাসনে বসানো হয়েছে, তখনই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবদমিত হয়েছে।
জয় বাংলার পরিবর্তে জিন্দাবাদ স্লোগান কেবল একটি শব্দ পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যা এই তথাকথিত ‘অপদার্থ’ ব্যক্তিদের কারণেই সম্ভব হয়েছে।
আদর্শিক পরাজয় না কি রণকৌশলগত ভুল?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অপমানিত করে রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে নির্বাসিত করার যে ধারা, তা একদিনে তৈরি হয়নি।
যখনই কোনো আপসকামী ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের উচ্চাসনে বসানো হয়েছে, তখনই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবদমিত হয়েছে।
বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ ‘জয় বাংলা’র পরিবর্তে বিদেশি শব্দ ‘জিন্দাবাদ’ স্লোগান কেবল একটি শব্দ পরিবর্তন নয়,
বরং এটি একটি গভীর আদর্শিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যা এই তথাকথিত ‘মেরুদণ্ডহীন’ ব্যক্তিদের কারণেই সম্ভব হয়েছে।
বর্তমান ও আগামীর রাজনৈতিক শিক্ষা
বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের এই মহাবিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।
গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যদি আদর্শিক দৃঢ়তা এবং মেরুদণ্ডসম্পন্ন ব্যক্তিদের না বসানো হয়, তবে তার খেসারত কেবল একটি দলকে নয়, পুরো জাতিকেই দিতে হয়।
বিশেষ করে সেনাপতি বা গোয়েন্দা প্রধানের মতো সংবেদনশীল পদগুলোতে ভুল লোক নিয়োগ দিলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বই হুমকির মুখে পড়ে।
জনগণের ক্ষোভ ও বিচারিক দায়বদ্ধতা
সাধারণ জনগণের মতে, যারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেও সংকটকালে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।
শেখ হাসিনা যাদের ‘বিশ্বস্ত’ ভেবেছিলেন, তারাই আসলে তার রাজনৈতিক পতনের পথ প্রশস্ত করেছেন।
জাতি আজ প্রশ্ন তুলছে—কেন বারবার এই ধরণের অযোগ্য ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের শীর্ষে বসানো হয়েছিল?
খেসারত ও ইতিহাসের শিক্ষা
শেখ হাসিনার শাসনামলে দুই শাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি বানানো ছিল ইতিহাসের এক বিশাল কৌশলগত ও আদর্শিক ভুল।
এই সিদ্ধান্তের ফলে দল কেবল ক্ষমতা হারায়নি, বরং জাতি হারিয়েছে তার মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য চেতনা।
জয় বাংলার পরিবর্তে জিন্দাবাদের জয়ধ্বনি এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অবমাননা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সময় এসেছে পুনর্মূল্যায়ন করার—কেন এবং কাদের স্বার্থে এই মেরুদণ্ডহীন ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের শীর্ষে বসানো হয়েছিল?
ইতিহাস হয়তো শেখ হাসিনাকে ক্ষমা করবে না এই ভুলের জন্য, কিন্তু জাতির জন্য এটি এক দীর্ঘস্থায়ী বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
