সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। টেন্ডারবাজি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে সিআইডির আবেদনের প্রেক্ষিতে এই আদেশ।
দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগে বড় ধরনের আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন। অবৈধ পথে অর্জিত বিপুল সম্পদ নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন আদালত।
সোমবার (৩০ মার্চ) ঢাকার মহানগর দায়রা জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন।
আদালতের আদেশ ও নেপথ্যের কারণ
সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন গণমাধ্যমকে আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিদেশ যাত্রা ঠেকাতে আদালতে একটি জরুরি আবেদন জমা দেয়।
সিআইডির উপ-পরিদর্শক মো. আব্দুল হান্নান তার আবেদনে উল্লেখ করেন যে,
অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করে দেশ-বিদেশে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, তিনি যেকোনো মুহূর্তে দেশত্যাগ করতে পারেন—এমন আশঙ্কায় তদন্তের স্বার্থে এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জরুরি হয়ে পড়েছিল।
অভিযোগের পাহাড়: টেন্ডারবাজি থেকে বিদেশে সম্পত্তি
মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর।
সিআইডির দাবি অনুযায়ী, তিনি যখন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের এপিএস হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন, তখন ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বিভিন্ন সেক্টরে ‘তদবির বাণিজ্য’ শুরু করেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে:
- টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ: স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বড় বড় টেন্ডার নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অংকের কমিশন গ্রহণ।
- চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট: প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ।
- বিদেশে অর্থ পাচার: অবৈধভাবে উপার্জিত এই বিশাল অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করেছেন বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে। এমনকি এসব দেশে তার নামে-বেনামে স্থাবর সম্পত্তি অর্জনের তথ্যও এখন সিআইডির রাডারে।
মানিলন্ডারিং আইনের আওতায় কঠোর অনুসন্ধান
বর্তমানে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে একটি গভীর অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সিআইডি আদালতকে জানিয়েছে,
অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি দেশ ছেড়ে চলে যান, তবে এই অর্থ পাচারের শেকড় খুঁজে বের করা এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এ কারণেই ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং বিশেষ শাখাকে (এসবি) অবিলম্বে তাকে দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুরনো দুর্নীতির রেকর্ড: দুদকের নজরেও ছিলেন মোয়াজ্জেম
এটিই প্রথম নয় যে মোয়াজ্জেম হোসেন আইনি জটিলতায় পড়েছেন।
এর আগে গত বছরের ২৪ মে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লক করার পাশাপাশি দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।
বারবার এমন অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন উঠেছে—একজন এপিএস পদের কর্মকর্তা কীভাবে এত বড় ক্ষমতার বলয় তৈরি করতে সক্ষম হলেন?
রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়ার ঝড়
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ সহকারীর বিরুদ্ধে এমন গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন,
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রকৃত পরীক্ষা হবে মোয়াজ্জেম হোসেনের মতো ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে।
যদি তদন্তে শত কোটি টাকা পাচারের সত্যতা মেলে, তবে তা বর্তমান প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আইনের শাসনের অগ্নিপরীক্ষা
বিদেশে সম্পদ গড়ার নেশায় যারা দেশের টাকা বাইরে পাচার করছেন, তাদের জন্য এই আদালতের নির্দেশ একটি শক্তিশালী বার্তা।
মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর চপেটাঘাত।
এখন দেখার বিষয়, সিআইডির তদন্তে এই ‘তদবির বাণিজ্যের’ রাঘববোয়ালদের নাম বেরিয়ে আসে কি না এবং পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে রাষ্ট্র কতটা সফল হয়।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মোয়াজ্জেম হোসেনকে দেশের মাটিতেই থাকতে হচ্ছে এবং কড়া নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
এই মামলার পরবর্তী আপডেট জানতে আমাদের সাথেই থাকুন।
