বাঁশখালীতে শ্রমিক সংকটে বিপাকে পড়া কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে ছাত্রলীগ। ধান কাটা ও মাড়াই করে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার এই মানবিক উদ্যোগ এলাকায় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী | প্রকাশ: ৮ মে, ২০২৬, (বাঁশখালী, চট্টগ্রাম): কাঠফাটা রোদ আর শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ফলে যখন সোনালী ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দিশেহারা উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকরা, ঠিক তখনই কাস্তে হাতে মাঠে নামলেন একদল তরুণ। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় অসহায় ও সম্বলহীন কৃষকদের ধান কেটে, মাড়াই করে তা নিজ কাঁধে বয়ে আঙিনায় পৌঁছে দিয়ে নজির স্থাপন করেছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে গত ৭ মে (বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমটি এখন স্থানীয় জনপদে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
শ্রমিক সংকট ও কৃষকের হাহাকার
চলতি মৌসুমে বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নে ধানের ফলন বেশ ভালো হয়েছে।
তবে আনন্দ বিষাদে রূপ নেয় যখন মাঠের ধান পেকে যাওয়ার পরও তা কাটার জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না।
একদিকে তীব্র তাপদাহ, অন্যদিকে আকাশছোঁয়া শ্রমিক মজুরির কারণে অনেক ক্ষুদ্র চাষি তাদের স্বপ্ন হাহাকারে ভেসে যাওয়ার শঙ্কায় ছিলেন।
বিশেষ করে বাঁশখালীর দুর্গম এলাকাগুলোতে এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করে।
মাঠে নামলো একদল তরুণ
বৃহস্পতিবার ভোরে যখন সূর্যের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে, তখন বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী কাস্তে হাতে একত্রিত হন।
কোনো প্রকার বিনিময় বা পারিশ্রমিক ছাড়াই তারা দলবেঁধে নেমে পড়েন কৃষকের ধান খেতে।
দিনভর রোদে পুড়ে তারা শুধু ধানই কাটেননি, বরং যান্ত্রিক মাড়াই শেষে সেই ধান বস্তাবন্দি করে কৃষকের ঘরে তুলে দিয়েছেন।
ছাত্রলীগের এই অভাবনীয় উদ্যোগে সুবিধাভোগী একজন কৃষক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “ধান পেকে ঝরে যাচ্ছিল, কিন্তু কাটার মানুষ পাচ্ছিলাম না।
এই ছেলেরা দেবদূতের মতো এসে আমার পুরো বছরের অন্ন রক্ষা করেছে।”
নিষেধাজ্ঞা ও জনকল্যাণের বিতর্ক
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংগঠনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষিত হলেও, তাদের এই জনহিতকর কার্যক্রম জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও, প্রশাসনের নজর এড়িয়ে সরাসরি মাঠে নেমে সাধারণ মানুষের সেবা করায় এলাকায় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছেন তারা।
অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, “রাজনীতি যে ধারারই হোক, মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত সাহসিকতা।”
নেতাকর্মীদের বক্তব্য: সেবা ও আদর্শ
ধান কাটা কর্মসূচি শেষে বাঁশখালী উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা মুহাম্মদ বোরহান উদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন:
“ছাত্রলীগ একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠন যার মূল ভিত্তিই হলো শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতি। রাজনৈতিক সংকটের চেয়ে আমাদের কাছে মানুষের জীবনের সংকট বড়। কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় আমরা কেবল মানবিক দায়িত্ব পালন করেছি। অতীতেও দেশের যেকোনো দুর্যোগে ছাত্রলীগ প্রথম সারিতে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। আমাদের সার্থকতা রাজনীতির পদ-পদবীতে নয়, বরং কৃষকের হাসিতে।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, তারা কেবল ধান কেটেই দায়িত্ব শেষ করেননি, বরং বাঁশখালীর প্রান্তিক কৃষকদের যেকোনো সমস্যায় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশংসার জোয়ার
ছাত্রলীগের এই কার্যক্রমের ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর তা দ্রুত ভাইরাল হয়। নেটিজেনদের অনেকেই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, “শ্রমিক সংকটের এই দুঃসময়ে তরুণ প্রজন্মের এমন কর্মঠ ভুমিকা সত্যিই অনুকরণীয়।”
তবে সচেতন মহলের কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এমন জমায়েত নিয়ে প্রশ্ন তুললেও মানবিকতার বিচারে এই উদ্যোগকে ছোট করে দেখছেন না কেউ।
উপকূলীয় এই জনপদে ধান কাটার এই মৌসুমে ছাত্রলীগের অংশগ্রহণ স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।
যেসব কৃষক অর্থাভাবে ধান কাটতে পারছিলেন না, তাদের জন্য এটি ছিল এক বিশাল আশির্বাদ।
বাঁশখালীর এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মানুষের সেবা করার মানসিকতা থাকলে কোনো বাধাই বাধা নয়।
ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কেবল ধান কাটেননি, বরং তারা প্রমাণ করেছেন যে তারুণ্যের শক্তি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে সমাজ বদলে দেওয়া সম্ভব।
