সিনেমা ছাড়ার দুই যুগ পরও দর্শকের ভালোবাসায় আলোচনায় চিত্রনায়ক নাইম। জন্মদিনে জানালেন জনপ্রিয়তা ধরে রাখার গল্প।
বাংলা চলচ্চিত্রের নব্বই দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক খাজা নাইম মুরাদ, যিনি দর্শকের কাছে শুধু নাইম নামেই পরিচিত, সিনেমা থেকে দূরে আছেন প্রায় দুই যুগ। তবুও জন্মদিন এলেই ভক্তদের শুভেচ্ছা, ফোনকল, খুদেবার্তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভালোবাসায় ভরে ওঠে তার দিন। সময়ের স্রোতে বদলে গেছে চলচ্চিত্র অঙ্গন, এসেছে নতুন প্রজন্মের নায়ক-নায়িকা; কিন্তু দর্শকের মনে এখনো অমলিন নাইম-শাবনাজ জুটির স্মৃতি।
জন্মদিন উপলক্ষে গণমাধ্যমে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় নাইম বলেন, মানুষের এই ভালোবাসাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। খুব বেশি সিনেমায় অভিনয় না করেও দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারাটা তার কাছে বিস্ময়কর ও আনন্দের।
নবাব পরিবারের সন্তান থেকে চলচ্চিত্র তারকা
১৯৭০ সালের ৮ মে ঢাকার ধানমন্ডিতে জন্ম নেওয়া নাইম বেড়ে উঠেছেন ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশে। তিনি ঢাকার নবাব পরিবারের বংশধর এবং নবাব স্যার সলিমুল্লাহ তার প্রপিতামহ। শৈশব কেটেছে শাহবাগ ও মগবাজার এলাকায়। তবে গ্রামের প্রতি তার টান ছিল ছোটবেলা থেকেই।
টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদারবাড়ি এবং দেলদুয়ারের পাতরাইলের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক পরবর্তীতে জীবনের বড় অংশ হয়ে ওঠে।
‘চাঁদনী’ থেকে তারকাখ্যাতি
চলচ্চিত্রে নাইমের অভিষেক ঘটে কিংবদন্তি পরিচালক এহতেশামের হাত ধরে ‘চাঁদনী’ সিনেমার মাধ্যমে। এই ছবিতেই গড়ে ওঠে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি নাইম-শাবনাজ।
পর্দার রসায়ন বাস্তব জীবনেও রূপ নেয় ভালোবাসায়। ‘বিষের বাঁশি’ সিনেমার শুটিং চলাকালে তাদের সম্পর্কের শুরু,
যা পরে গভীর সম্পর্কে পরিণত হয়। দীর্ঘদিনের সম্পর্কের পর ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর বিয়ে করেন এই তারকা জুটি।
নাইম-শাবনাজ অভিনীত ‘চোখে চোখে’, ‘সোনিয়া’, ‘দিল’, ‘টাকার অহংকার’, ‘অনুতপ্ত’, ‘জিদ’ ও ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’সহ একাধিক সিনেমা দর্শকপ্রিয়তা পায়।
পারিবারিক গল্পনির্ভর এসব সিনেমা আজও টেলিভিশন দর্শকের কাছে সমান জনপ্রিয়।
ঠিক সময়েই সিনেমা ছাড়ার সিদ্ধান্ত
২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’ ছিল নাইম-শাবনাজ জুটির শেষ সিনেমা। এরপর ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন নাইম।
এ বিষয়ে তার বক্তব্য, চলচ্চিত্রের মান যখন পরিবর্তিত হতে শুরু করে, তখন নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তই ছিল সঠিক।
তার মতে, সময়মতো বিদায় নেওয়ার কারণেই দর্শকের কাছে তাদের জনপ্রিয়তা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
তিনি মনে করেন, বিটিভির মাধ্যমে তাদের সিনেমাগুলো ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়ায় পরিবারকেন্দ্রিক দর্শকদের সঙ্গে এক ধরনের আবেগী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যা আজও অটুট রয়েছে।
গ্রামীণ জীবনে নতুন অধ্যায়
রুপালি পর্দা থেকে দূরে সরে গিয়ে এখন টাঙ্গাইলের পাতরাইলে কৃষি ও উৎপাদননির্ভর জীবন গড়ে তুলেছেন নাইম।
মাছের খামার, ফলের বাগান, পশুপালন এবং তাঁতের কারখানা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে তার।
শুধু ব্যবসা নয়, গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় রয়েছেন তিনি।
স্থানীয় তরুণদের নিয়ে একটি ক্লাব গড়ে তুলে প্রতিবছর ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করেন, যেখানে শহরের শিল্পীরাও অংশ নেন।
ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় অর্জন
নাইম মনে করেন, জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী হলেও মানুষের ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী। আজও দর্শক যখন নাইম-শাবনাজ জুটির নাম স্মরণ করেন, তখন সেটিকেই তিনি জীবনের বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন।
তার ভাষায়, “মানুষ এখনো মনে রেখেছে, এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
