জুলাই আন্দোলনের মুখ মেহনাজ আজিরিন শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সাম্প্রতিক মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে কী বললেন তিনি?
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, জুলাই বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথ কাঁপানো অন্যতম মুখ এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী নাফসিন মেহনাজ আজিরিন এবার সরব হয়েছেন বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত মন্তব্যের বিরুদ্ধে। মন্ত্রীর ব্যবহৃত শব্দ চয়ন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিকে ‘উগ্র’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন মেহনাজ। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি মন্ত্রীর সমালোচনা করে মেহনাজ বলেন, একজন দায়িত্বশীল পদে থেকে অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা ঢালাওভাবে কোনো গোষ্ঠীকে অভিযুক্ত করা সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ নয়।
উগ্র মনোভাব পরিহারের পরামর্শ
সংবাদ সম্মেলনে মেহনাজ আজিরিন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে, শিক্ষামন্ত্রীর কথাবার্তায় এক ধরনের অহমিকা ও উগ্রতা প্রকাশ পায়।
তিনি বলেন, “মাননীয় মন্ত্রীর বাচনভঙ্গি এমন যে, তিনি মনে করেন তিনিই পৃথিবীর একমাত্র সৎ ও সঠিক ব্যক্তি, আর বাকি সবাই ভুল পথে চলছে।
এই ধরনের মানসিকতা একটি গণতান্ত্রিক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সুখকর নয়।”
মেহনাজ মনে করেন, একজন অভিভাবক হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতি মন্ত্রীর ভাষা আরও অনেক বেশি মার্জিত ও উন্নত হওয়া উচিত ছিল।
তিনি শিক্ষামন্ত্রীকে নিজের ভাষা ও আচরণে সংযম আনার সবিনয় আহ্বান জানান।
জঙ্গিবাদ বিতর্ক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষামন্ত্রীর একটি সাম্প্রতিক মন্তব্য যেখানে তিনি বলেছিলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত স্বাধীনতা দিলে তারা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে যেতে পারে”
এই বক্তব্যটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
এর প্রতিবাদে মেহনাজ ১৮ জুলাইয়ের রক্তঝরা দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “শিক্ষামন্ত্রী কি ভুলে গেছেন ১৮ জুলাইয়ের ইতিহাস?
সেদিন যদি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জীবন বাজি রেখে রাজপথে না নামত, তাহলে আজ পরিস্থিতি কোথায় থাকত?
যারা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বুক পেতে দিয়েছে, তাদের ঢালাওভাবে জঙ্গিবাদের আশঙ্কায় ফেলা চূড়ান্ত অবমাননা।”
ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠানের নয়: মেহনাজের যুক্তি
কোনো বিশেষ ঘটনার জন্য পুরো শিক্ষার্থী সমাজ বা একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সংস্কৃতি বন্ধ করার দাবি জানান মেহনাজ। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন:
অপরাধীর কোনো পরিচয় নেই: একজন সন্ত্রাসীর কোনো নির্দিষ্ট পরিবার, সমাজ বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় মুখ্য হতে পারে না।
যৌথ দায়বদ্ধতার অভাব: একজনের ব্যক্তিগত ভুল বা অপরাধের জন্য হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ওপর কলঙ্ক লেপন করা অন্যায্য।
ইতিবাচক অবদান: জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছে তারা দেশপ্রেমিক এবং সচেতন।
রাজনৈতিক কাঠামো ছাড়াই ছাত্রশক্তির জাগরণ
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত প্রকাশ্য ছাত্র রাজনীতি বা ডাকসুর মতো কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নেই।
এই বিষয়টি উল্লেখ করে মেহনাজ বলেন, “আমাদের কোনো বড় রাজনৈতিক ব্যানার নেই, ছাত্রসংগঠনের লেজুড়বৃত্তি নেই।
তা সত্ত্বেও জুলাই আন্দোলনে আমরা যে অদম্য সাহস দেখিয়েছি, তা বিশ্ববাসী দেখেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামো না থাকলেও আমাদের চেতনার ঐক্য যে কতটা শক্তিশালী, তা এই বিপ্লব প্রমাণ করে দিয়েছে।”
শিক্ষাবিদদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের আবেগ ও তাদের অবদানকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। এমন অবস্থায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে নেতিবাচক মন্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি করতে পারে। মেহনাজের এই প্রতিবাদ মূলত সেই বিশাল ছাত্র সমাজেরই কণ্ঠস্বর।
মেহনাজ আজিরিনের এই সাহসী অবস্থান সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, নতুন বাংলাদেশে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং ক্ষমতাধারীদের আচরণ ও ভাষারও পরিবর্তন আসা জরুরি। শিক্ষামন্ত্রীর মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের কাছ থেকে গঠনমূলক সমালোচনা প্রত্যাশা করে ছাত্রসমাজ, কোনোভাবেই তা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অবমাননাকর না হয়।
