দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক পটভূমিতে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বহুমুখী তৎপরতা এবং নতুন অক্ষ গঠনের নেপথ্য সমীকরণ নিয়ে বিশেষ কলাম।
বিশ্লেষকঃ অধ্যাপক ড. আরিফ খান: বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও তার চারপাশের অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার এক অন্যতম প্রধান ক্রীড়াক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দৃশ্যমান রাজনৈতিক পালাবদল বা কূটনৈতিক সফরের আড়ালে নেপথ্যে প্রতিনিয়ত নানা গোপন সমীকরণ, লবিং এবং কৌশলগত অক্ষ তৈরি হচ্ছে। একদিকে ওয়াশিংটন ও দিল্লির মধ্যকার জটিল বোঝাপড়া, অন্যদিকে আঙ্কারা, ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের নিজস্ব কৌশলগত চাল—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এক অত্যন্ত সংবেদনশীল মোড় পার করছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণ, আর্থিক খাতের অন্দরমহল এবং প্রবাসে অবস্থানরত একশ্রেণীর কুশীলবদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা দলগুলোর ছক আঁকার ক্ষেত্রে নতুন নতুন উপাদানের জোগান দিচ্ছে। এই পুরো নেটওয়ার্ক এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
লন্ডনের গোপন লবিং এবং ‘পরিমার্জিত’ রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অতি সম্প্রতি সালাউদ্দিন নামক এক আলোচিত ব্যক্তির যুক্তরাজ্য (UK) সফরকে কেন্দ্র করে নানামুখী গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।
ওপর ওপর এই সফরটিকে তাঁর মেয়ের সাথে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ হিসেবে দেখানো হলেও, এর ভেতরে গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে জানা যাচ্ছে। কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল তথাকথিত ‘ডার্টি মানি’ বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ পারাপার এবং বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে তা বৈধ করার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
ইউরেশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের গোয়েন্দা দাবার চাল: পিনাকী ও জুলকারনাইন সমীকরণ
এই ভূ-রাজনৈতিক খেলায় সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার বা তথ্যযুদ্ধের উপাদানগুলো অত্যন্ত সক্রিয়।
এক্ষেত্রে পিনাকী ভট্টাচার্যের মতো আলোচিত ব্যক্তিদের ভূমিকা ভিন্ন আঙ্গিকে মূল্যায়িত হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, পিনাকী মূলত তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (MIT) একজন কৌশলগত এজেন্ট বা ‘অ্যাসেট’ হিসেবে কাজ করছেন।
তাঁর এই অবস্থানটি অত্যন্ত গতিশীল; তিনি আঞ্চলিক স্বার্থের প্রয়োজনে কখনো পাকিস্তানের সাথে,
আবার কখনো চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোর সাথেও সমান্তরাল জোটে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক সিআইএ (CIA)-র শক্তিশালী মিডিয়া স্টেশন হিসেবে পরিচিত আল জাজিরার সাথে যুক্ত জুলকারনাইন সায়ের খানের ভূমিকাও কম রহস্যময় নয়। গোয়েন্দা পরিভাষায় তাঁকে ‘মিডিয়া এস্পিওনাজ’ বা প্রচার মাধ্যমভিত্তিক গোয়েন্দা সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই ধরণের এজেন্টদের কোনো স্থায়ী আনুগত্য থাকে না; তারা নিজেদের মিশন সফল করতে কখনো মোসাদ, কখনো ভারতের ‘র’ (RAW), আবার কখনো ন্যাটোর (NATO) মতো পশ্চিমা সামরিক জোটের সাথে যৌথভাবে কাজ করে।
গোয়েন্দা অক্ষের ভাঙা-গড়া:
২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের পূর্ব পর্যন্ত জুলকারনাইন ও তাঁর সংশ্লিষ্ট সার্কেলটি তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটি (MIT)-র সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল। কিন্তু একপর্যায়ে এমআইটি যখন বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানকে বাংলাদেশে ফেরার আইনি ও কৌশলগত পথ সুগম করতে রাশিয়ার তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী সংস্থা কেজিবি (KGB)-র সাথে একটি বিশেষ সমঝোতায় পৌঁছায়, তখন থেকেই জুলকারনাইন এই তুর্কি অক্ষ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা শুরু করেন। ফলস্বরূপ, এই গোষ্ঠীটি এখন সিআইএ ও মোসাদের অতি কাছাকাছি চলে গেছে এবং ওয়াশিংটনের এজেন্ডা অনুযায়ী ভারতকে প্রভাবিত করতে ক্ষেত্রবিশেষে ‘র’-এর সাথেও একযোগে কাজ করছে।
তথ্য সন্ত্রাস, মনস্তাত্ত্বিক প্রকৌশল এবং ইলিয়াস হোসাইনের ভূমিকা
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আরেকটি বড় হাতিয়ার হলো ‘ইনফরমেশন টেররিজম’ বা তথ্য সন্ত্রাস এবং ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা জনমত তৈরির মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।
এই ধারায় ইলিয়াস হোসাইন এখনো পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI)-র একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রজেক্টাইল অ্যাসেট হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।
আন্তঃসীমান্ত গোয়েন্দা প্রকল্পের অংশ হিসেবে তিনি বিভিন্ন স্পর্শকাতর কনটেন্ট ও জনমতকে প্রভাবিত করার মতো প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কাজে লিপ্ত।
এই প্রজেক্টগুলোর গভীরতা এতটাই বেশি যে, এরা কখনো কখনো চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (PLA) কাউন্টারপার্ট এবং সে দেশের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা এমএসএস (MSS)-এর সাথেও সমন্বয় করে কাজ করে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-আন্দোলনের সময় বেইজিংয়ের এমএসএস মূলত আইএসআই-কে ব্যাকআপ দিয়েছিল। তবে ওপর থেকে পুরো অপারেশনটির সুতো ছিল সিআইএ-র হাতে, যেখানে আইএসআই মাঠপর্যায়ে সরাসরি স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে কাজ করেছিল এবং নেপথ্য থেকে তুরস্কের এমআইটি ও চীনের এমএসএস-এর পূর্ণ সমর্থন বজায় ছিল।
দিল্লির নীরবতা, সিআইএ-র প্রলোভন এবং ‘কোয়াড’ সমীকরণ
এই পুরো মহাপরিকল্পনা বা গ্র্যান্ড ডিজাইনের বিষয়ে ভারতের বাহ্যিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW) প্রথম দিকে খুব একটা স্পষ্ট ধারণা করতে পারেনি। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ এবং ইসরায়েলের মোসাদের দেওয়া একটি বিশেষ টোপ বা প্রলোভন। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব দিল্লিকে আশ্বস্ত করেছিল যে, বাংলাদেশে সিআইএ-র এই বিশেষ অপারেশনের মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে চীনকে প্রতিহত করে ‘কোয়াড’ (Quad) ব্লককে আরও শক্তিশালী ও মজবুত করা।
নিজেদের সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে সিআইএ-কে বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্স কাজ করার অনুমতি দেওয়ার সবুজ সংকেত থাকায় ‘র’ দীর্ঘ সময় নীরব ছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে যখন দেখা গেল যে, সিআইএ কোয়াডকে শক্তিশালী করার নাম করে উল্টো ভারতের দুই কট্টর প্রতিদ্বন্দ্বী
—পাকিস্তানের আইএসআই এবং তুরস্কের এমআইটি-কে ঢাকার নীতি-নির্ধারণী টেবিলে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, তখন দিল্লির নীতিনির্ধারকরা চরম ক্ষুব্ধ ও প্রতারিত বোধ করেন।
ভারতের সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত দুর্বলতা হলো, তারা নিজেদের সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের কথা মুখে বললেও, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এখনো স্বাধীন কৌশল নেওয়ার চেয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ওপর বেশি নির্ভরশীল।
এই মার্কিন-নির্ভরতা ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তার জন্যই বড় ধরণের বিপদ ডেকে আনছে।
সিআইএ এবং মোসাদের এই ‘ডিপ স্টেট’ বা পর্দার আড়ালের অদৃশ্য সরকারের গোয়েন্দা প্রকল্পের কারণে সামগ্রিকভাবে তিনটে দেশ চরম ভূ- ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে:
- বাংলাদেশ: যেখানে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ ও গোয়েন্দা যুদ্ধ চলছে।
- মিয়ানমার: জান্তা সরকার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বে যা অলরেডি জ্বলছে।
- ভারত: নিজের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে পশ্চিমা আধিপত্যের কারণে যা চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
‘এশিয়ান ন্যাটো’ এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর
এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর,
যিনি ইতিপূর্বে দীর্ঘ সময় ধরে তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটি (MIT)-র প্রধান বা ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এই উচ্চপর্যায়ের সফরের নেপথ্যে কেবল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নয়, বরং একটি বিশাল সামরিক ও কৌশলগত সমীকরণ কাজ করছে।
ধারণা করা হচ্ছে, তুর্কি এই নীতি-নির্ধারক দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন ‘এশিয়ান ন্যাটো’ (Asian NATO) গড়ে তোলার লক্ষ্যে অত্যন্ত চতুর ও দূরদর্শী চাল চালছেন।
এই নতুন সামরিক ও কৌশলগত ম্যাপিংয়ের মূল স্তম্ভ হিসেবে ভাবা হচ্ছে:
- পাকিস্তান
- তুরস্ক
- বাংলাদেশ
ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি (OIC)-র ভেতরে তুরস্কের যে সমস্ত শক্তিশালী মিত্র রয়েছে, তারা এই পরিকল্পনায় পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে বর্তমানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের যে সমস্ত দীর্ঘমেয়াদী প্রজেক্ট রয়েছে, সেগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও টিকিয়ে রাখার জন্য রাজনৈতিক দল বিএনপির কাঁধকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে করে এই অঞ্চলের নতুন ভূ-রাজনৈতিক অক্ষটি কোনো বাধা ছাড়াই পূর্ণতা পায়।
কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ?
প্রফেসর ড. আরিফ খানের এই গভীর বিশ্লেষণটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বাংলাদেশের মাটি এখন কেবল অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু নয়,
বরং এটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর এক জটিল দাবা বোর্ডে পরিণত হয়েছে।
সিআইএ, মোসাদ, আইএসআই, এমআইটি এবং র-এর এই বহুমুখী টানাটানি এবং নতুন ‘এশিয়ান ন্যাটো’ গঠনের গুঞ্জন আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্বকে এক বড় ধরণের পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাবে।
বাংলাদেশ যদি নিজের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে একটি সুষম ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে না পারে,
তবে এই বহিরাগত ডিপ স্টেটের গোয়েন্দা প্রজেক্টগুলোর খপ্পরে পড়ে দেশ এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হতে পারে।
তাই বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে এই বৈশ্বিক দাবার চালগুলো মোকাবেলা করতে হবে।
