বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে এনপিএ। জ্বালানি সার্বভৌমত্বে ৮ দফা দাবি উত্থাপন।
বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারে এনপিএর ৮ দফা দাবি
বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে সংস্কার ও জনস্বার্থ রক্ষায় আট দফা দাবি উত্থাপন করেছে সংগঠনটি।
শুক্রবার (১৯ জুন) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সমাবেশে অংশ নেওয়া নেতারা অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপকে তীব্র করবে।
মূল্যবৃদ্ধিকে ‘অযৌক্তিক’ বলছে এনপিএ
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য বাকী বিল্লাহ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলেও বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে ভোক্তাদের বাড়তি মূল্য দিতে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অতীতে জ্বালানি খাত থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ মুনাফা করেছে, কিন্তু বৈশ্বিক সংকটের সময় সেই বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে যখন মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী, তখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে।
বাজেট নিয়েও সমালোচনা
এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য অনিক রায় সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটেরও সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমান বাজেট বাস্তব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পরিবর্তে প্রবৃদ্ধিনির্ভর আশাবাদী ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
অনিক রায়ের ভাষ্য, সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের প্রকৃত সমস্যা ও অর্থনৈতিক সংকটের পরিবর্তে অন্য বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সামাজিক খাতে ইতিবাচক দিক থাকলেও উদ্বেগ জ্বালানি খাতে
এনপিএর আরেক নেতা মেঘমল্লার বসু বলেন, এবারের বাজেটে শিক্ষা, গবেষণা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে।
তবে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে তিনি গণস্বার্থবিরোধী বলে উল্লেখ করেন।
তার মতে, জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর পরিবর্তে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াবে।
এনপিএর ৮ দফা দাবির মূল বিষয়গুলো
সমাবেশে সংগঠনের পক্ষে লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন কেন্দ্রীয় কাউন্সিল সদস্য শামীম আরা। সেখানে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে আট দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়।
দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির ব্যর্থতার কারণে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ প্রদান।
- আবাসিক খাতের মতো শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতেও ধাপভিত্তিক বিদ্যুৎ মূল্যহার চালু।
- ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য পৃথক বিদ্যুৎ নীতিমালা।
- কৃষিসেচ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য বিদ্যুতের প্রথম ২০০ ইউনিটে মূল্যবৃদ্ধি না করা।
- নেপাল ও ভুটান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে জলবিদ্যুৎ আমদানি।
- দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা।
- ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা।
- বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
জ্বালানি খাতে সংস্কারের দাবি
সমাবেশে বক্তারা বলেন, শুধু মূল্যবৃদ্ধি নয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করাও জরুরি।
তারা মনে করেন, উৎপাদন, সরবরাহ এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর না করে বারবার মূল্যবৃদ্ধি করলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশও মনে করেন, জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে জনমনে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, তখন এনপিএর এই কর্মসূচি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরা হলেও বিরোধী মত ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছে।
এখন সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং জ্বালানি খাতের সংস্কার উদ্যোগই হবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
