গরমে বেশি বিদ্যুৎ বিলের পেছনে অসাধু কর্মকর্তাদের ভূমিকা আছে কি না তা খতিয়ে দেখার ঘোষণা দিয়েছেন বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ-মন্ত্রী
বেশি বিদ্যুৎ বিলে অসাধুদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে
গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি আসার পেছনে কোনো অসাধু কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ বিল বাড়ার পেছনে নানা বাস্তব কারণ থাকতে পারে, তবে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ এলে সরকার তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখবে।
সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, গরমের সময়ে অনেক পরিবারে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যায়। ফলে বিদ্যুৎ খরচও স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমি বলছি না আমাদের সবাই সৎ। কোথাও যদি অনিয়ম বা অসাধু কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা থাকে, তাহলে সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।”
তিনি আরও জানান, বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ সরকারের নজরে আসে। এসব বিষয়ে সাংবাদিকদেরও দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিচ্ছে সরকার
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ উপদেষ্টা বলেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। তবে কৃষিজমি নষ্ট করে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে না।
তার ভাষায়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌর, বায়ু এবং অন্যান্য বিকল্প জ্বালানি উৎসের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানির চাপও কমবে।
বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের চিত্র
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র বেসরকারি খাতের হাতে রয়েছে।
ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, আগের সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক আর্থিক অপচয় হয়েছে এবং প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া
বর্তমান সরকারের ওপর চাপ হিসেবে রয়ে গেছে। এই দেনা পরিশোধ করাই এখন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ
উপদেষ্টা বলেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানিও আমদানি করতে হয়। সরকার সময়মতো বকেয়া পরিশোধ করতে না পারলে
এসব প্রতিষ্ঠান জ্বালানি কিনতে পারে না। ফলে অনেক সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তিনি জানান, সরকার একদিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের চাপ কমানোর বিষয়েও কাজ করছে।
ফলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনে গঠন করা হয়েছে প্রযুক্তিগত দল
বিদ্যুৎ খাতের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ (টেকনিক্যাল) দল গঠন করা হয়েছে বলেও জানান ইকবাল হাসানমাহমুদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) একজন সাবেক চেয়ারম্যানকে প্রধান করে এই দল গঠন করা হয়েছে।
দলটি দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করে উৎপাদন, দক্ষতা এবং পরিচালনাগত সমস্যা মূল্যায়ন করবে।
জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
অনুষ্ঠানে বক্তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং ভোক্তাবান্ধব নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে আমদানি ব্যয় কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাত আরও টেকসই হবে।
সরকারও একই লক্ষ্য সামনে রেখে বিদ্যুৎ খাতে সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা
এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে।
