জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ ভুল শক্তিতে গেছে মন্তব্য করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রধান চরমোনাই পীর বলেন, শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দিয়ে হতাশা এসেছে।
শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দিয়ে জুলাইয়ের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি: চরমোনাই পীর
অনলাইন রাজনৈতিক প্রতিবেদক •
ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ বিগত দিনের প্রতিটি রাজনৈতিক সংগ্রাম ও গণআন্দোলনের পরপরই দেশের শাসনভার এমন এক অশুভ শক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাদের কাছে ইসলাম, দেশের ভৌগোলিক স্বাধীনতা কিংবা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কখনোই সুরক্ষিত ছিল না। এই ঐতিহাসিক ভুলকে ‘শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেওয়া’র সঙ্গে তুলনা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চরমোনাই পীর ও আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।
তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতীত থেকে কঠিন শিক্ষা না নিয়ে বারবার একই রাজনৈতিক শক্তির হাতে ক্ষমতা সোপর্দ করার কারণেই আজ জাতির ভাগ্যে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। তাই জাতীয় ভাগ্য ও ব্যবস্থার প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য ইসলামকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন করার কোনো বিকল্প নেই।
গত রোববার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত ঐতিহাসিক ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষ্যে ‘চেতনায় জুলাই’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব
সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অতীত পটভূমি ও ক্ষমতার হাতবদলের অন্ধকার দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এদেশের জনগণ বারবার রাজপথে রক্ত দিয়ে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করেছে, কিন্তু আন্দোলনের ফসল বারবার ছিনতাই হয়ে গেছে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক চক্রের হাতে।
তিনি বলেন:
“আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিতে যতগুলো অভ্যুত্থান বা বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে, দিনশেষে লাভ হয়েছে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর। জনগণ যাদের ওপর বিশ্বাস রেখে ক্ষমতা হস্তান্তর করে, তারাই পরবর্তীতে দেশ ও মানুষের আমানত খেয়ানত করে। শিয়ালের মতো ধূর্ত শক্তির কাছে বিশ্বাস করে মুরগি বর্গা দেওয়ার মতো বোকামি জাতি বারবার করেছে বলেই আজ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আসল চেতনা ও গণমানুষের প্রত্যাশা আলোর মুখ দেখেনি।”
চরমোনাই পীর জোর দিয়ে বলেন, এখন আর পুরনো ও পরীক্ষিত কোনো অপশক্তির ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। ইসলাম, দেশ ও মানবতার সুরক্ষায় দেশের তৌহিদী জনতা ও যুবসমাজকে রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সুসংগঠিতভাবে মাঠে নামতে হবে।
(এখানে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইসলামী যুব আন্দোলনের সভায় চরমোনাই পীরের বক্তব্যের ছবি যুক্ত করুন)
ক্যাপশন: জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘চেতনায় জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। (ছবি: সংগৃহীত)
স্মৃতিতে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই: রক্তঝরা সেই দিনের কথা
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান ২০২৪ সালের রক্তঝরা জুলাই আন্দোলনের এক ভয়াল ও রোমহর্ষক স্মৃতিতর্পণ করেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানী ঢাকায় চরমোনাই পীরের সরাসরি উপস্থিতিতে ইসলামী যুব আন্দোলন একটি বিশাল গণমিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করেছিল। সেদিন তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী ও ক্যাডাররা নিরস্ত্র যুবজনতার ওপর মুহুর্মুহু গুলি বর্ষণ করে। এতে ইসলামী যুব আন্দোলনের শতাধিক নেতাকর্মী ও দায়িত্বশীল মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ ও আহত হন।
তিনি দাবি করেন, জুলাই বিপ্লবের রক্তপিচ্ছিল পথে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ ও রক্তের অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
‘রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভারতীয় দালালচক্র’: মোসাদ্দেক বিল্লাহর হুঁশিয়ারি
দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী তাঁর বক্তব্যে জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের অভ্যন্তরীণ
রাজনীতিতে বিদেশী আধিপত্যবাদের বিষাক্ত প্রভাব নিয়ে কড়া হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
তিনি বলেন, ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটলেও তাদের আসল মদদদাতা ও অনুচরেরা এখনও গা ঢাকা দিয়ে আছে।
“দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রশাসনের নানা স্তরে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনও ভারতীয় আধিপত্যবাদের দালালরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তারা দেশের প্রতিটি অর্জনকে ভেতর থেকে নস্যাৎ করার গভীর চক্রান্তে লিপ্ত। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে এই সুযোগসন্ধানী ও দেশবিরোধী চক্রকে যেকোনো মূল্যে চিহ্নিত করে রুখে দাঁড়াতে হবে।”
যুব সমাজের ভূমিকা এবং সম্মেলন পরিচালনা
ইসলামী যুব আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি আতিকুর রহমান মুজাহিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জাতীয় আলোচনা সভাটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন
সংগঠনের জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল মুফতি রহমাতুল্লাহ বিন হাবিব এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা ইলিয়াস হাসান।
সভায় ইসলামী আন্দোলনের যুব নেতৃত্ব একমত পোষণ করে বলেন যে, তরুণদের বিভ্রান্ত করে রাজপথে নামিয়ে
একটি বিশেষ মহল সবসময় নিজেদের আখের গুছিয়েছে। এবার যুবসমাজ আর কোনো রাজনৈতিক প্রলোভনে পা দেবে না।
‘চেতনায় জুলাই’-কে ধারণ করে তারা দেশে ইসলামী হুকুমাত ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে আত্মনিয়োগ করবে।
সভায় অন্যান্যদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা নেছার উদ্দীন,
সহকারী মহাসচিব আতিকুর রহমান এবং ইসলামী যুব আন্দোলনের সেক্রেটারি জেনারেল মুফতি মানসুর আহমদ সাকীসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরী পর্যায়ের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
জাতীয় রাজনীতিতে ইসলামী শক্তির উত্থানের ডাক
আলোচনা সভার সমাপ্তি লগ্নে বক্তারা স্পষ্ট বার্তা দেন যে,
জুলাই আন্দোলনের বীর শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন কোনো ফ্যাসিবাদের বিস্তার বরদাশত করা হবে না।
দেশের বিদ্যমান সংকট উত্তরণে রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি জনগণের মৌলিক অধিকার, ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষায় সাধারণ মানুষ আলেম-ওলামাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানানতাঁরা।
চরমোনাই পীরের আহ্বানে সারা দিয়ে রাজপথে ইসলামী শক্তির ঐক্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার মাধ্যমে সভার যবনিকা ঘটে।
