২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটল লিওনেল মেসির। কাতার বিশ্বকাপের আনন্দাশ্রুর চার বছর পর এবার চোখের জলে বিদায় নিলেন ফুটবল জাদুকর।
স্পোর্টস ডেস্ক •
ফুটবল ঈশ্বর কি সবসময় রূপকথার শেষটা নিজের মতো করে সাজাতে দেন? হয়তো না। চার বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের মরুদ্যানে যে চোখের জল ছিল পরম তৃপ্তি ও দীর্ঘ প্রতীক্ষা ভাঙার আনন্দাশ্রু, চার বছর পর আটলান্টিকের পাড়ে সেই একই চোখ থেকে ঝরে পড়ল সীমাহীন বেদনার জল।
সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মহাযুদ্ধে স্পেনের কাছে হেরে হাতছাড়া হলো শিরোপা। আর সেই সাথে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চ থেকে মহাতারকা লিওনেল মেসির রূপকথার মতো বিদায় নেওয়ার শেষ স্বপ্নটিও অপূর্ণ থেকে গেল।
কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বজয়ের আনন্দে যিনি কেঁদেছিলেন, এবার নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তিনি কাঁদলেন পরাজয় আর একরাশ শূন্যতার ভার বুকে চেপে।
স্প্যানিশ দুর্গে বন্দি ফুটবল জাদুকর
শিরোপার মহাল লড়াইয়ে আজ নিজের নামের প্রতি ঠিক সুবিচার করতে পারেননি আটটি ব্যালন ডি’অর জয়ী এই ফুটবল পরামানব। পুরো ম্যাচ জুড়েই স্পেনের তরুণ ও অভিজ্ঞদের নিয়ে গড়া জমাট রক্ষণভাগ বলতে গেলে হাত-পা বেঁধে রেখেছিল আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে।
মাঠের মাঝখান থেকে খেলা তৈরির চেষ্টা করলেও স্প্যানিশ ডিফেন্ডারদের কড়া পাহারা টপকাতে পারেননি তিনি। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের একদম শেষ ভাগে দূরপাল্লার একটি শট এবং দু-একটি সেট-পিস থেকে সুযোগ তৈরি করা ছাড়া স্মরণীয় কোনো জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দিতে ব্যর্থ হন মেসি। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যায়—ল্যাটিন পরাশক্তিদের কাঁদিয়ে বিশ্ব ফুটবলের নতুন সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়েছে স্পেনের ‘লা ফুরিয়া রোজা’।

ক্যাপশন: মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনাল হারের পর আবেগ ধরে রাখতে না পেরে অশ্রুসিক্ত হন লিওনেল মেসি। (ছবি: সংগৃহীত)
স্থবির মহাতারকা ও ইয়ামালের সান্ত্বনা
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই পুরো স্টেডিয়াম যখন স্প্যানিশ সমর্থকদের গর্জনে কাঁপছিল, তখন মাঠের মাঝখানে একাকী নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মেসি। দুই হাত কোমরে রেখে শূন্য দৃষ্টিতে গ্যালারির দিকে চেয়ে দেখছিলেন হাজারো নীল-সাদা জার্সির ভক্তদের।
ক্লান্ত শরীর নিয়ে এক পর্যায়ে সবুজ ঘাসেই বসে পড়েন এই কিংবদন্তি। ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসেন স্পেনের বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল। ফাইনালের আগে যে দুই প্রজন্মের দ্বৈরথ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা ছিল, সেই ইয়ামাল বিজয়ী দলের উদযাপনের মাঝেই এগিয়ে গিয়ে শ্রদ্ধার সাথে জড়িয়ে ধরেন ফুটবল জাদুকরকে।
খুদে জাদুকরকে সান্ত্বনা জানানোর এই মুহূর্তটি ক্রীড়া ইতিহাসের এক অনন্য ছবি হয়ে থাকবে।
গ্যালারির ‘মেসি মেসি’ ধ্বনি এবং বাঁধভাঙা কান্না
ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে যাওয়ার আগে দ্রুত ড্রেসিংরুমে ফিরে যেতে চাইছিলেন মেসি।
কিন্তু তাঁকে যে সহজে ছাড়তে নারাজ গ্যালারির ভক্তরা! হার বা জিত—যাই হোক না কেন,
নিজেদের দেবতাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে পুরো মেটলাইফ স্টেডিয়াম একসুরে গর্জে ওঠে—‘মেসি, মেসি, মেসি…’।
হাজার হাজার ভক্তের করতালির সেই আবেগঘন ভালোবাসার জবাব দিতে গিয়ে আর নিজের মনের আগল ধরে রাখতে পারেননি মেসি।
চোখের কোণ বেয়ে অঝোর ধারায় নেমে আসে অশ্রু।
এত বছরের ত্যাগ, লড়াই, জয় আর শেষ বারের মতো ব্যর্থতার সমস্ত আবেগ একসঙ্গে ফুটে ওঠে তাঁর চেহারায়।
একটি অসমাপ্ত অধ্যায় ও কোটি ভক্তের হৃদয়ভঙ্গ
এই বিশ্বকাপটিই যে লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ছিল, তা নিয়ে কারও মনে কোনো দ্বিধা নেই।
কাতার জয়ের পরও হয়তো শুধুমাত্র আলবিসেলেস্তাদের জার্সিতে এই একটি শেষ স্বপ্নের টানেই নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে এতটা দীর্ঘায়িত করেছিলেন তিনি।
কিন্তু ফুটবল বড় নির্মম। সবাইকে একই সুতোয় বেঁধে সব গল্পের শেষটা সুখে হতে দেয় না।
শেষ পর্যন্ত চোখের জল সঙ্গী করেই টানেল দিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে হেঁটে গেলেন লিও।
যদি এটিই হয় আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ১০ নম্বর জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ আন্তর্জাতিক উপস্থিতি, তবে ইতিহাস মনে রাখবে—
বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা অধ্যায়ের যবনিকা ঘটেছিল একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং কোটি ফুটবলপ্রেমীর নীরব হৃদয়ভাঙার আর্তনাদের মধ্য দিয়ে।
