রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে উগ্রবাদী কার্যক্রম ও সদস্য সংগ্রহের মামলায় মূল হোতাসহ গ্রেপ্তার ৭ আসামিই এখন কারাগারে।
মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদ: যাত্রাবাড়ীর চাঞ্চল্যকর মামলায় মূল হোতাসহ ৭ আসামিই এখন কারাগারে, তদন্তে এটিইউ
আদালত প্রতিবেদক •
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় আত্মরক্ষামূলক কৌশল বা মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে নিষিদ্ধ উগ্রবাদী তৎপরতা ও সদস্য সংগ্রহের অভিযোগে দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় নতুন মোড় নিয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত সাত আসামির সবাইকেই বর্তমানে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রের প্রধান পরিকল্পনাকারী শাহ আমানত সাবির এবং অন্যতম সহযোগী মো. তাহসীন ইসলাম ইতিমধ্যেই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। রিমান্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাকি পাঁচ আসামিও এখন গাদাগাদি করে জেলের চার দেয়ালের ভেতরে দিন কাটাচ্ছেন। চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির নেপথ্যের আন্তর্জাতিক বা দেশীয় নেটওয়ার্কের খোঁজে এখন কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)।
আদালতের এজলাসে স্বীকারোক্তি: যেভাবে এলো সত্য
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামশেদ আলমের এজলাসে হাজির করা হলে আসামি মো. তাহসীন ইসলাম স্বেচ্ছায় অপরাধের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। এর ঠিক দুদিন আগে, মামলার ১ নম্বর আসামি শাহ আমানত সাবির অপর এক ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুল ইসলামের আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নথিভুক্ত করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) মহিন উদ্দীন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, গ্রেপ্তারকৃত সাতজনের মধ্যে দুজন আদালতে নিজেদের অপরাধের খতিয়ান তুলে ধরেছেন। বাকি পাঁচ আসামি—মো. হোসাইন তানিম, মো. জুনায়েদ, আতাউল্লাহ শাহ, মো. আবিদুর রহমান এবং মো. বায়োজিতকে রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে তোলা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাদেরও জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
(এখানে পুলিশ ও আদালতের প্রতীকী ছবি যুক্ত করুন)
ক্যাপশন: যাত্রাবাড়ীতে মার্শাল আর্টের আড়ালে উগ্রবাদী তৎপরতার অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে হাজির করার প্রক্রিয়া। (ফাইল ছবি)
‘মিনি কক্সবাজার’ থেকে যশোর: যেভাবে চলতো এই গোপন আস্তানা
এজহারের বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে যাত্রাবাড়ী থানার অন্তর্গত ‘মিনি কক্সবাজার’ নামক এলাকার একটি বালুর মাঠে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। সেখানে ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ নামের একটি রহস্যজনক ব্যানারের নিচে তরুণদের মার্শাল আর্ট শেখানো হচ্ছিল। তবে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, এটি কেবলই একটি খোলস; এর ভেতরে চলছে রাষ্ট্রবিরোধী উগ্র মতাদর্শের পাঠদান।
ঘটনাস্থল থেকে প্রথমে ছয়জনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ দেশের সীমান্ত জেলা যশোরে অভিযান চালিয়ে মো. তাহসীন ইসলাম ওরফে সুলতান ওরফে মুসান্নাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এ বি সিদ্দিকী বাদী হয়ে মোট ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ (সংশোধিত ২০১৩)-এর একাধিক ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন।
‘সাবির ভাইয়ের জামাত’ ও সাইবার নেটওয়ার্কের গোপন আখ্যান
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে, গ্রেপ্তারকৃতরা পর্দার আড়ালে ‘সাবির ভাইয়ের জামাত’ নামে একটি নতুন উপদল বা সংগঠন গড়ে তুলেছিল। তাদের মূল অস্ত্র ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
যেভাবে ছড়ানো হতো জাল:
- অনলাইন প্রচারণা: ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ নামের একটি ফেসবুক পেজ খুলে প্রথমে সাধারণ তরুণদের শারীরিক কসরত ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখার আমন্ত্রণ জানানো হতো।
- সদস্য যাচাইকরণ: পেজের মাধ্যমে যারা যোগাযোগ করতেন, তাদের মধ্য থেকে উগ্রবাদে আগ্রহী বা কোমলমতি তরুণদের আলাদা করা হতো।
- ছদ্মনামে চ্যাটিং: একবার সদস্যভুক্ত হওয়ার পর তারা ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ
- এবং বিশেষ করে এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ‘টেলিগ্রাম’-এ ছদ্মনাম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে গোপন বৈঠক ও যোগাযোগের নেটওয়ার্ক সচল রাখতো।
আদালতে পক্ষে-বিপক্ষের আইনি লড়াই
মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করে যে, এই চক্রটি দেশে খেলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে এক ধরনের উগ্র মতাদর্শ ছড়াচ্ছিল।
আসামিরা বয়সে তরুণ হওয়ায়, কার প্ররোচনায় বা অর্থায়নে তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়িয়েছে, তাজানার জন্য নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন ছিল।
পুলিশ প্রথম দফায় আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, তাদের মক্কেলরা সম্পূর্ণ নির্দোষ
এবং কোনো ধরনের জঙ্গি বা উগ্রপন্থী সংগঠনের সাথে তাদের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। আধুনিক যুগে আত্মরক্ষা বা ফিটনেসের
জন্য মার্শাল আর্ট শেখানো একটি সাধারণ বিষয় এবং এর আড়ালে কোনো গোপন উদ্দেশ্য ছিল না বলে তারা জামিনের আবেদন করেন।
তবে আদালত অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে জামিন নামঞ্জুর করেন।
এটিইউ-এর কাঁধে তদন্তভার: কোন দিকে যাচ্ছে মামলা?
যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু জানিয়েছেন,
প্রাথমিক অনুসন্ধানে আসামিদের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের সাথে অকাট্য প্রমাণ মেলার পরই তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যেহেতু এটি একটি স্পর্শকাতর
এবং নেটওয়ার্কভিত্তিক অপরাধের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাই মামলাটির ডকেট এখন পুলিশের ‘অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট’ (এটিইউ)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে,
বর্তমান যুগে প্রথাগত বড় বড় সংগঠনের চেয়ে অনলাইনভিত্তিক ছোটছোট স্বনির্ভর সেল বা গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
যাত্রাবাড়ীর এই মডিউলটি ঠিক তেমনই একটি ‘লোন উলফ’ বা ছোট গোপন সেল ছিল কি না,
কিংবা এর পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর অর্থায়ন রয়েছে কি না—তা এখন এটিইউ-এর তদন্তের মূল ফোকাস।
পলাতক থাকা বাকি ৯ আসামিকে খুঁজে বের করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।
