পটুয়াখালী-১ আসনের এমপি আলতাফ হোসেন চৌধুরীর প্রত্যক্ষ উসকানিতে মির্জাগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা লাভলুর বসতবাড়ি বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির বিরুদ্ধে।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক চরম ও ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। পটুয়াখালী-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরীর প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও উসকানিতে মাধবখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কাজী মিজানুর রহমান লাভলুর পৈতৃক ও ক্রয়কৃত জমিতে নির্মিত বসতবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুধু ভবন ধ্বংসই নয়, ভাঙচুরের পর সেখানে ব্যাপক লুটপাট চালিয়ে পুরো বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে বলে ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করেছে।
গত শুক্রবার (১৭ জুলাই ২০২৬) গভীর রাতে উপজেলার কাঁঠালতলী বাজার সংলগ্ন উত্তর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই নজিরবিহীন তাণ্ডব চালানো হয়। অভিযোগ উঠেছে, এমপি আলতাফ হোসেন চৌধুরীর ছোট ভাই ও মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহীন চৌধুরী স্বয়ং স্থানীয় প্রায় আড়াইশত নেতাকর্মীকে নিয়ে এই মব বা হামলাকারী দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে জবরদখল উচ্ছেদ দাবি করে একটি ফেসবুক পোস্ট করা হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভুক্তভোগীদের মতে—এমপির সেই বক্তব্যই মূলত মব ও স্থানীয় বিএনপিকে উসকে দেওয়ার এবং এই বর্বরোচিত ধ্বংসযজ্ঞের সুস্পষ্ট নির্দেশনামা বা প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে।

গভীর রাতের নীল নকশা: পুলিশকে ধাওয়া ও জনতাকে অবরুদ্ধকরণ
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্তদের সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার রাত ১২টার পর হঠাৎ করেই কাঁঠালতলী বাজার ও এর আশপাশের এলাকা একদল সশস্ত্র ক্যাডার কর্ডন বা অবরুদ্ধ করে ফেলে। হামলার পূর্বমুহূর্তে বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে এলাকা থেকে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই নারকীয় তাণ্ডবের কোনো প্রমাণ যেন বাইরে না আসতে পারে, সেজন্য কেউ মুঠোফোনে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলেই তাঁর ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ভেঙে ফেলা হয়।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, আক্রান্ত বাড়িটি থেকে মাত্র ৩০ ফুট দূরে কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়ির অবস্থান। গভীর রাতে যখন একটি ভারী এক্সকাভেটর বা বেকু (খনন) মেশিন দিয়ে পাকা ভবন ভাঙার বিকট শব্দ আসছিল, তখন পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু হামলাকারীরা সংখ্যায় বিপুল ও উগ্র থাকায় তারা পুলিশকে উল্টো ধাওয়া করে। ফলে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হন। এই সুযোগে টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে ভাঙচুর ও লুটপাট।
খালি বাড়ির সুযোগে কোটি টাকার ক্ষতি ও লুটপাটের তাণ্ডব
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই মাধবখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান লাভলু সপরিবারে এলাকাছাড়া হয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। বাড়িতে কেবল তাঁর বৃদ্ধা শাশুড়ি বা মা বসবাস করতেন। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে গত শুক্রবার বিকেলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফলে পুরো বাড়িটি সম্পূর্ণ ফাঁকা ও তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল।
এই সুযোগটিকেই লুফে নেয় হামলাকারীরা। লাভলু কাজীর স্ত্রী মেহেরুন্নেছা শিল্পী ঢাকা থেকে শনিবার ভোরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গণমাধ্যমকে জানান:
“মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহিন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ হাওলাদার এবং সাবেক সভাপতি মনির খন্দকারের সরাসরি কমান্ডে আড়াইশ মানুষের একটি হিংস্র দল বুলডোজার দিয়ে আমাদের সাজানো পাকা বসতঘরটি মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। ভবন ভাঙার পর ঘরে থাকা ৪টি ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, এয়ার কন্ডিশনার (এসি), বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়। এরপর ছয় কক্ষের প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।”
ফায়ার সার্ভিস ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভয়াবহ বর্ণনা
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে মির্জাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
মির্জাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম জানান, শনিবার সকাল ৬টা ৮ মিনিটে তারা সংবাদ পান।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখা যায়, ছয় কক্ষের পাকা ভবনটির সামনের অংশ সম্পূর্ণ ভাঙা এবং চারপাশের কক্ষগুলোতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।
ফায়ার কর্মীরা দ্রুত তৎপরতা চালিয়ে চারটি কক্ষের আগুন নেভাতে সক্ষম হলেও ততক্ষণে ভেতরের সমস্ত আসবাবপত্র ওমূল্যবান সামগ্রী ভস্মীভূত হয়ে যায়।
ঘটনার পর লাভলু কাজীর ভাই মশিউর রহমান বাবলু কাজী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞের কিছু ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে
প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। লাভলুর ফুফাতো বোন মুকুল বেগম বলেন,
“এটি কোনো সাধারণ উচ্ছেদ নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে একটি পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।”
এমপির ফেসবুক পোস্ট: উসকানি নাকি সাফাই?
এই ঘটনার পর পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরীর একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
পোস্টে পরোক্ষভাবে এই ভাঙচুরকে ‘ফ্যাসিস্টদের অবৈধ সম্পদ উচ্ছেদ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
এমপির পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলা হয়, "যারা বিগত দিনে দেশকে বিদেশী করদ রাজ্যে পরিণত করেছিল, লক্ষ কোটি টাকা পাচার করে অর্থনীতি পঙ্গু করেছিল, তারাই সরকারি মানুষের সম্পদ অবৈধভাবে দখল করে প্রাসাদ বানিয়েছিল। আজ যারা এদের জন্য মায়াকান্না করছেন, তারা আসলে গুপ্ত ফ্যাসিবাদের দোসর।
ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি,
এমপির এই প্রকাশ্য রাজনৈতিক হুংকার ও উসকানিমূলক বক্তব্যই প্রমাণকরে যে, তাঁর গ্রিন সিগন্যাল বা প্রত্যক্ষ নির্দেশছাড়া মির্জাগঞ্জে এতবড় মব জাস্টিস
বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সাহস কেউ পেত না। এটি একটি স্বাধীন দেশে গভীর ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ।
জমি দখলের অভিযোগ বনাম ভুক্তভোগীর আরজি
বিএনপির স্থানীয় সাবেক সভাপতি মনির খন্দকার দাবি করেছেন যে,
মিজানুর রহমান লাভলু পাবলিক লাইব্রেরির সরকারি জমি দখল করে এই প্রাসাদ বানিয়েছিলেন এবং ভূমি অফিসের মাধ্যমে তা প্রমাণিত।
তবে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা কাজী মিজানুর রহমান লাভলু মুঠোফোনে জানান:
“আমি কোনো সরকারি জমি দখল করিনি। নিজের বৈধ উপার্জনে জমি কিনে আমি এই বাড়িটি নির্মাণ করেছিলাম। আজ যারা আমার বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিলো, তাদের সাথে আমার কোনো ব্যক্তিগত জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নেই। শুধুমাত্র পটুয়াখালী-১ আসনের এমপি আলতাফ হোসেন চৌধুরীর অনুসারী ও স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে আমার মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁইটুকু কেড়ে নিয়েছে।”
আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনের বক্তব্য
এই বর্বরোচিত হামলার পর মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তৌহিদুজ্জামান জানান, গভীর রাতে কিছু অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি এক্সকাভেটর বা বেকুমেশিন
দিয়ে বাড়িটি ভাঙচুর করে ও আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘরের ভেতরে কেউ না থাকায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে এখনো ভুক্তভোগী
পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত এজাহার বা মামলা দায়ের করা হয়নি। পুলিশ পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে।
মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ মো. রাসেল জানান, খবর পেয়েই তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলেছেন।
এলাকার পরিবেশ শান্ত রাখতে এবং দোষীদের চিহ্নিত করতে কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়িকে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে কোনো নাগরিকের সম্পত্তি যদি অবৈধও হয়, তা উচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।
আইন নিজের হাতেতুলে নিয়ে গভীররাতে প্রকাশ্য দিবালোকে বুলডোজার দিয়ে বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং লুটপাট শেষে আগুন ধরিয়েদেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
একজন বর্তমান সংসদ সদস্যের নাম যেখানে প্রত্যক্ষ নির্দেশদাতা হিসেবে আসছে,
সেখানে প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা।
