শেখ হাসিনার মেগা থার্ড টার্মিনাল চালু হচ্ছে আগামী ১৬ ডিসেম্বর। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে জাপানের চুক্তি ও আকাশসীমায় আয় বৃদ্ধির সুখবর দিল বেবিচক।
শেখ হাসিনার মেগা থার্ড টার্মিনাল চালু বিজয় দিবসেই: জাপান চুক্তি
অনলাইন জাতীয় ও এভিয়েশন ডেস্ক
প্রকাশিত: বিশেষ অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন
ছবি: চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দৃষ্টিনন্দন মেগা থার্ড টার্মিনাল।
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের ইতিহাস বদলে দিতে পুরোপুরি প্রস্তুত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত ‘মেগা থার্ড টার্মিনাল’। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মেগা উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত এই বিশাল স্থাপনাটি আগামী ১৬ ডিসেম্বর—দেশের মহান বিজয় দিবসের মাহেন্দ্রক্ষণেই সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের পরিষেবা ও যাত্রী ভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে টার্মিনালটির ‘গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং’ বা ভূমি ব্যবস্থাপনার বড় দায়িত্ব হস্তান্তরিত হচ্ছে জাপানি প্রতিষ্ঠানের হাতে। এ লক্ষ্যে চলতি আগস্টের শেষভাগে কিংবা সেপ্টেম্বরের শুরুতেই দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) শীর্ষ পর্যায় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়সূচি ও সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করে মেগা এই প্রকল্পের সমুদয় কাজ চূড়ান্ত রূপ দেওয়া হচ্ছে।
মেগা প্রকল্প ও নতুন প্রশাসনিক কর্মপরিকল্পনা
বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক আকাশপথের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে শেখ হাসিনার সরকার যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, তার চূড়ান্ত ফসল এই থার্ড টার্মিনাল। সম্প্রতি রাজধানীর কুর্মিটোলায় অবস্থিত বেবিচক সদর দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত “সিভিল এভিয়েশন অ্যান্ড এয়ার ট্রাফিক অপারেশনস” শীর্ষক এক প্রশিক্ষণমূলক কর্মশালায় সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তা ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরেন।
কর্মশালায় জানানো হয়, অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ শতভাগ সফলতার সাথে সম্পন্ন হওয়ার পর এখন চলছে অভ্যন্তরীণ পরিচালনা এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার কাজ।
“মাননীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা এবং সরকারের সার্বিক ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী ১৬ ডিসেম্বরের শুভ লগ্নেই টার্মিনালের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করতে আমরা বদ্ধপরিকর। যাত্রীদের নিরাপদ সেবা এবং আধুনিক নিরাপত্তায় কোনো আপস করা হবে না।”
— এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, চেয়ারম্যান, বেবিচক।
জাপানের হাতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং: বিমানবন্দরে আসছে গুণগত পরিবর্তন
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং এবং গ্রাউন্ড সার্ভিসের ক্ষেত্রে যেসব অভিযোগ বা অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হতো যাত্রীদের, মেগা থার্ড টার্মিনাল চালুর মাধ্যমে তার স্থায়ী সমাধান হতে যাচ্ছে। এই টার্মিনালের সার্বিক পরিচালনা ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হচ্ছে বিশ্বখ্যাত জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতে।
কেন জাপানি কনসোর্টিয়ামের উপর আস্থা?
- বিশ্বমানের সার্ভিস ডেলিভারি: জাপানের টোকিও, হানেদা কিংবা নারিতা বিমানবন্দরের মতো নিখুঁত ও অত্যন্ত দ্রুতগতির ব্যাগেজ সোর্টিং ব্যবস্থা চালু হবে।
- স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি নির্ভরতা: যাত্রীদের লাগেজ ট্র্যাকিং এবং বোর্ডিং প্রক্রিয়ায় থাকছে সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি।
- যাত্রী ভোগান্তি বিলোপ: উড়োজাহাজ অবতরণের পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রলি বা লাগেজের জন্য অপেক্ষার অবসান ঘটবে।
চলতি মাসের শেষে অথবা আগামী মাসের প্রারম্ভেই বেবিচক ও জাপানি উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে এই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সংক্রান্ত চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।
আকাশসীমা পরিচালনায় যুগান্তকারী বিপ্লব: আয় বাড়বে ৮ শতাংশ
বাংলাদেশের সার্বভৌম আকাশসীমা ব্যবহারকারী বৈশ্বিক এয়ারলাইন্সগুলোর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ উপলক্ষে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিকায়ন করেছে বেবিচক।
ছবি: আধুনিক ডিজিটাল স্যাটেলাইট এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ব্যবস্থার মাধ্যমে বৃদ্ধি পাবে এভিয়েশন রাজস্ব।
বেবিচকের কারিগরি দল নিশ্চিত করেছে, নতুন স্যাটেলাইটভিত্তিক এটিসি নেভিগেশন সুবিধা যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী বিদেশী উড়োজাহাজ থেকে সংগৃহীত ‘ফ্লাইট ওভার ফ্লাইং চার্জ’ বা রুট নেভিগেশন ফি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
| এভিয়েশন সূচক | পূর্বের অবস্থা | মেগা থার্ড টার্মিনাল পরবর্তী প্রাক্কলন |
| এটিসি ট্র্যাকিং ব্যবস্থা | প্রথাগত এনালগ ও গ্রাউন্ড রাডার | আধুনিক ডিজিটাল ও স্যাটেলাইট নেভিগেশন |
| আকাশসীমার পরিচালন ক্ষমতা | সীমিত ফ্লাইট তদারকি | বহুগুণ বেশি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা |
| বাৎসরিক রাজস্ব বৃদ্ধি | সাধারণ ও স্থিতিশীল আয় | অতিরিক্ত ৮% পর্যন্ত রাজস্ব প্রবৃদ্ধি |
এই অভাবনীয় আধুনিকীকরণের ফলে শুধু যে এয়ার ট্রাফিক জ্যাম বা ফ্লাইট বিলম্ব কমবে তা নয়, বৈশ্বিক আকাশপথের বাণিজ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
নিরাপত্তা বিধানে বড় কড়াকড়ি: আনা হচ্ছে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম
বিমানবন্দরের রানওয়ে, টেক-অফ ও ল্যান্ডিং জোনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে যেকোনো অননুমোদিত ড্রোন। বিশ্বজুড়ে এয়ারপোর্ট নিরাপত্তার জন্য এটি একটি বড় হুমকি। এই নিরাপত্তা ঝুঁকি স্থায়ীভাবে দূর করতে শাহজালালে বসানো হচ্ছে সর্বাধুনিক 기술ের অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি।
চলতি বছর বা অর্থবছরের মধ্যেই মেগা থার্ড টার্মিনাল ও সংলগ্ন এলাকার সুরক্ষায় এই অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম (Anti-Drone System) যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে যেকোনো অননুমোদিত ড্রোন বা রিমোট কন্ট্রোলড ডিভাইস স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্যাম বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে।
[ অননুমোদিত ড্রোনের উপস্থিতি ] ➔ [ অ্যান্টি-ড্রোন রাডার সেন্সর ] ➔ [ সিগন্যাল জ্যামিং ও নিষ্ক্রিয়করণ ]
একই সাথে বেবিচকের পক্ষ থেকে দেশের সাধারণ নাগরিক এবং গণমাধ্যমকর্মী ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে—বিমানবন্দর বা এর আশেপাশের এলাকায় ড্রোন উড্ডয়ন থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকার জন্য।
কারিগরি এভিয়েশন সাংবাদিকতা: আইকাও নীতিমালার গুরুত্ব
বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মশালায় জোর দিয়ে বলা হয়, সিভিল এভিয়েশন খাতটি পুরোপুরি বৈশ্বিক এবং আইকাও (ICAO)-এর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত।
আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন সংস্থাসমূহের মানদণ্ড (SARPs)
অনুষ্ঠানে বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানান,
বিমানবন্দর পরিচালনা, ‘এয়ারসাইড’ (যেখানে বিমান থাকে) ও ‘ল্যান্ডসাইড’ (যেখানে যাত্রীদের আগমন-বর্হিগমন ঘটে) অপারেশনস
এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে SARPs (Standards and Recommended Practices) বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ১০০% সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
সাংবাদিকদের তথ্যগত নির্ভুলতা নিশ্চিত ও কারিগরি সচেতনতা বৃদ্ধির এই উদ্যোগ শেষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে আনুষ্ঠানিক সনদপত্র তুলে দেন বেবিচক প্রধান।
সাধারণ জিজ্ঞাসাবলী (FAQ)
১. শেখ হাসিনার মেগা থার্ড টার্মিনাল কবে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হচ্ছে?
উত্তর: সবকিছু ঠিক থাকলে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের শুভ দিনে টার্মিনালটি পুরোপুরি যাত্রী চলাচলের জন্য চালু করা হচ্ছে।
২. নতুন মেগা টার্মিনালের সার্ভিস পরিচালনার দায়িত্ব কারা পাচ্ছে?
উত্তর: গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং যাত্রীসেবার মান আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করতে জাপানের অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা চুক্তি হচ্ছে।
৩. নতুন এটিসি ও এভিয়েশন অবকাঠামো থেকে দেশের কী লাভ হবে?
উত্তর: এটিসি ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিদেশী বিমান থেকে দেশের রাজস্ব আয় বার্ষিক ৮% বৃদ্ধি পাবে
এবং ট্রানজিট যাত্রী বৃদ্ধির ফলে পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে।
পর্যালোচনা
শেখ হাসিনার আমলের উন্নয়ন ভাবনার অন্যতম প্রধান আলোকবর্তিকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মেগা থার্ড টার্মিনাল।
১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবসে এইমেগা প্রকল্পের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু হওয়া বাংলাদেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক বিশাল মাইলফলক।
জাপানের সাথে চুক্তি,
স্যাটেলাইট এটিসি ট্র্যাকিং ও অ্যান্টি-ড্রোন সিকিউরিটি চালুর মাধ্যমে শাহজালাল বিমানবন্দর এখন এশিয়ার অন্যতম আধুনিক এভিয়েশন হাবে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
