কিয়ার স্টারমারের বিদায়ের পর ব্রিটেনের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী হলেন ‘কিং অব দ্য নর্থ’ অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। রাজা তৃতীয় চার্লসের আমন্ত্রণে গঠন করলেন নতুন সরকার।
১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ‘কিং অব দ্য নর্থ’: যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক •
ব্রিটিশ রাজনীতিতে আবার ক্ষমতার পালাবদল। ১০ বছরের চরম রাজনৈতিক উত্তাল তরঙ্গের মাঝে যুক্তরাজ্য পেল তার সপ্তম প্রধানমন্ত্রীকে। সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) বাকিংহাম প্যালেসে রাজা তৃতীয় চার্লসের সাথে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ ও রাজকীয় আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে দেশের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির প্রভাবশালী নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
এর মধ্য দিয়ে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে সমাপ্তি ঘটল স্যার কিয়ার স্টারমারের দুই বছরের শাসন অধ্যায়ের। জাতীয় নির্বাচনে বিশাল সাফল্যের মুখ দেখার দুই বছর যেতে না যেতেই রাজনৈতিক সমীকরণ ও জনপ্রিয়তায় ভাটার কারণে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হলো তাঁকে। আর সেই জায়গায় নতুন কাণ্ডারী হিসেবে আবির্ভূত হলেন গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক জনপ্রিয় মেয়র, যাঁকে ব্রিটিশ রাজনীতির অঙ্গনে সবাই এক নামে চেনেন ‘কিং অব দ্য নর্থ’ বা ‘উত্তরের রাজা’ হিসেবে।
রাজকীয় স্বীকৃতি ও ক্ষমতার হস্তান্তর
লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী প্রথা অনুযায়ী রাজা তৃতীয় চার্লস নতুন সরকার গঠনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে আহ্বান জানান।
রাজকীয় সম্মতি ও প্রথাগত ‘কিসিং হ্যান্ডস’ অনুষ্ঠান শেষে ব্রিটেনের সরকার প্রধান হিসেবে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন,
দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের মধ্যে আস্থার অভাব দূর করাই হবে তাঁর প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার।

ক্যাপশন: যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লসের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে সরকার গঠন করলেন নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। (ছবি: সংগৃহীত)
‘কিং অব দ্য নর্থ’ থেকে ১০ ডাউনিং স্ট্রিট: রাজনৈতিক ক্যারিয়ার
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ব্রিটিশ রাজনীতির ময়দানে কোনো নতুন মুখ নন। লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা দীর্ঘদিনের।
বিশেষ করে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে টানা কয়েক মেয়াদে তিনি যেভাবে স্থানীয় জনগণের সেবা নিশ্চিত করেছেন এবং লন্ডনের কেন্দ্রীকৃত ক্ষমতার
বাইরে গিয়ে উত্তর ইংল্যান্ডের অধিকার আদায়ে সোচ্চার থেকেছেন, তা তাঁকে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
এর আগে লেবার পার্টির পূর্ববর্তী সরকারগুলোতেও মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন বার্নহ্যাম। স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি
নির্ধারণী জায়গায় তাঁর সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতাকেই লেবার পার্টি তাদের ঝিমিয়ে পড়া ভাবমূর্তি পুনরুজ্জীবিত করার মূল হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে।
সামনে আন্তর্জাতিক অগ্নিপরীক্ষা: ট্রাম্প ফ্যাক্টর
দায়িত্ব নেওয়ার সাথে সাথেই বিশ্ব রাজনীতির ভূ-রাজনৈতিক খেলায় কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে যাচ্ছেন বার্নহ্যাম।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আটলান্টিকের দুই পারের সম্পর্কের রসায়ন কেমন হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিস্তর কৌতুহল।
দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ট্রাম্প প্রকাশ্যে বার্নহ্যামকে ‘অত্যন্ত চরমপন্থী উদারতাবাদী’ (Ultra-Liberal) বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
ফলে ওয়াশিংটনের সাথে লন্ডনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কীভাবে তিনি সামাল দেন, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিল সমীকরণ ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মাঠ এখন অত্যন্ত জটিল ও বিভাজিত। বিগত ১০ বছরে বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক
এবং সম্প্রতি কিয়ার স্টারমারের বিদায়ের পর ভোটারদের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রধান অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জসমূহ:
- ডানপন্থীদের উত্থান: নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন চরম ডানপন্থী দল ‘রিফর্ম ইউকে’ যুক্তরাজ্যজুড়ে সাধারণ ভোটারদের মন জয় করে লেবার পার্টির ভোটব্যাংকে বড় ধরণের ফাটল ধরিয়েছে।
- প্রগতিশীলদের ক্ষোভ: অন্যদিকে, পরিবেশবাদী ও প্রগতিশীল ভোটাররা কিয়ার স্টারমারের সরকারের সময় লেবার পার্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে ‘গ্রিন পার্টি’র দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছিল।
- অর্থনৈতিক সংকট: জীবনযাত্রার রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (NHS)-এর ভঙ্গুর দশা সামাল দেওয়া হবে বার্নহ্যামের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
পূর্বসূরিদের পরিণতি এড়িয়ে টিকে থাকার লড়াই
গত এক দশকে ডাউনিং স্ট্রিটের ক্ষমতা দখলের লড়াই আর দ্রুত বিদায়ের মিছিল দেখেছে ব্রিটিশবাসী। স্বল্পমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস
থেকে শুরু করে মেয়াদ পূরণ করতে না পারা সুনাক ও স্টারমার—সবাইকেই বিদায় নিতে হয়েছে তীব্র জন অসন্তোষের মুখে।
বিশ্লেষকদের মতে, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম যদি সাধারণ ব্রিটিশদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে না পারেন
এবং অর্থনৈতিক কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হন, তবে তাঁর অবস্থাও পূর্বসূরিদের মতোই ক্ষণস্থায়ী হতে পারে।
তবে তাঁর মাঠপর্যায়ের জনসংযোগ এবং ‘কিং অব দ্য নর্থ’ ভাবমূর্তি তাঁকে হয়তো সাধারণ মানুষের আরও কাছে নিয়ে যাবে।
