বিএনপির বিতর্কিত শাসন ও দেশ ধ্বংসের চক্রান্ত নিয়ে তীব্র সমালোচনা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি ও ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক অঙ্গনে শাসনব্যবস্থা, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্র নিয়ে সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বর্তমান প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের কার্যক্রম নিয়ে জনগণের একাংশের মধ্যে নানাবিধ অসন্তোষ দানা বাঁধছে। দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মব সংস্কৃতির প্রভাব
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে মব কালচার বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলার সংস্কৃতি জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন, নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
আইনের শাসন কঠোরভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন সচেতন নাগরিকরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে সমালোচকদের দাবি। এই ধরনের নৈরাজ্যমূলক পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
মেগা প্রকল্প ও সরকারি খাতের দুর্নীতির অভিযোগ
রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প এবং সেবাখাতে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে বড় বড় মেগা প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি এবং অস্বচ্ছতার বিষয়টি বারবার আলোচনায় আসছে। বিমানবন্দর পরিচালনা, বড় অবকাঠামো নির্মাণ এবং রেলওয়ে খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের অভিযোগ উঠেছে। যথাযথ তদারকির অভাবে এসব ক্ষেত্রে জনসাধারণের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না।
দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ও অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হচ্ছে। এসব দুর্নীতি সাধারণ মানুষের মাঝে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক সংকট
দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির উচ্চ হার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বাজার সিন্ডিকেট এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাবে চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে সব ধরনের জিনিসের দাম নাগালের বাইরে। ফলে সাধারণ নাগরিকদের বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
কৃষক সমাজেও রয়েছে চরম অসন্তোষ। সার, বীজ ও সেচের প্রয়োজনীয় উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহের ঘাটতি কৃষকদের উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত করছে। বেকারত্ব দূরীকরণের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।
কলকারখানা ও উৎপাদনমুখী খাতে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ বেকারত্বে ভুগছে।
মুদ্রাস্ফীতির চাপ সামলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছে।
নাগরিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার সংকোচন
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার মৌলিক বিষয় হলেও বর্তমানে তা হুমকির মুখে পড়েছে।
সরকারের সমালোচনা করলেই মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের।
ভয়ের সংস্কৃতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছে না।
প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নেওয়ার ফলে সমাজে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে।
নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার কারণে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। আইনের অপব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মুক্তচিন্তার চর্চাও নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের পরিবেশ কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
উত্তরণের উপায় ও ভবিষ্যতের করণীয়
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিটি অঙ্গনে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমাজের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে হবে।
সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।
নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সঠিক তদারকি দেশের এই সংকটজনক পরিস্থিতি বদলাতে সাহায্য করতে পারে।
দেশকে একটি কার্যকর ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে হলে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
জনগণের অধিকার ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
